প্রণব মুখার্জির প্রশ্নবিদ্ধ সফর ও রক্তাক্ত বাংলাদেশ
সৈয়দ আবদাল আহমদ
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও তাঁর সহধর্মিণী শুভ্রা মুখার্জি তিনদিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জির এটা ছিল প্রথম বিদেশ সফর। বাংলাদেশে তাঁর এ সফরটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন গোটা দেশ রক্তাক্ত। মাওলানা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায়-পরবর্তী প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দমন করতে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী চলছে হরতাল, অবরোধ, সহিংসতা। এমন এক অস্থির সময়ে প্রণব মুখার্জির এই সফর জন্ম দিয়েছে অনেক প্রশ্নের।
প্রণব মুখার্জি প্রতিবেশী ভারতের মতো বিশাল একটি দেশের শুধু রাষ্ট্রপতিই নন, তিনি দেশটির প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি। শিক্ষকতায় তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ভারতখ্যাত একজন রাজনীতিবিদ। তাঁর মতো প্রশাসনিক ও পার্লামেন্টারি অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদটি এর আগে কেউ অলঙ্কৃত করেননি। তিনি ভারতের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন। পাঁচবার তিনি ছিলেন রাজ্যসভার সদস্য এবং ২০০৪ সাল থেকে লোকসভার সদস্য। একইভাবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটিতে আছেন। ৭৮ বছর বয়সের এই রাজনীতিবিদ ২০১২ সালের ২৫ জুলাই ভারতের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। প্রণব মুখার্জি আমাদের অত্যন্ত কাছের একজন মানুষ। বলা যায় বাংলাদেশের একজন পরম আত্মীয়। বাংলাদেশের নড়াইলে তাঁর শ্বশুরবাড়ি।
এমন একজন মানুষ যখন বাংলাদেশে বেড়াতে আসবেন সেটা নিঃসন্দেহে আমাদের সবার কাছে খুশির খবর। আমরা তাঁকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানাব, কাছে টেনে নেব, তাঁর কথা শুনে এবং সাহচর্যে মুগ্ধ হবো। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, তাঁর এই সফরে আমরা খুশি হতে পারিনি। এটা ঠিক যে, তাঁর এ সফরটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা ও বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানিত করার জন্য বাংলাদেশের আমন্ত্রণেই ছিল তাঁর সফর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে তাঁর এ সফরে দোষের কিছুই ছিল না। দোষের যে কারণ তা হচ্ছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রণব মুখার্জিকে স্বাগত জানানোর জন্য দেশে একটি নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। প্রণব মুখার্জির সফরের ঠিক কয়েকদিন আগে হঠাত্ করেই মাওলানা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। অনেকের ধারণা ছিল, রায় ঘোষণা হবে প্রণব মুখার্জির সফরের পর। কিন্তু দেখা গেল ট্রাইব্যুনাল হঠাত্ করে ঘোষণা দেয় যে, কাল সাঈদীর রায়। ফলে রায় ঘোষণার পর মুহূর্তের মধ্যে সারা বাংলাদেশ বারুদের মতো জ্বলে ওঠে।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এদেশের জনপ্রিয় একজন আলেমে দ্বীন। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি শুধু বাংলাদেশেই নন, বিশ্বময় কোরআনের আলো ছড়িয়েছেন। ইসলাম, মহানবী (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, নামাজ-রোজা, হজ, জাকাত এবং ঈমান সম্পর্কে মানুষকে আলোকিত করেছেন। যেখানে যেদিন তাঁর মাহফিল বা ওয়াজ থাকত, সেখানে তাঁর কথা শোনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত মানুষ। দেশ-বিদেশে আকাশচুম্বী জনপ্রিয় এ আলেমকে সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মিথ্যা অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করে। দেশব্যাপী মানুষের প্রচণ্ড প্রতিবাদই প্রমাণ করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও ফাঁসির রায়টি চরম বিতর্কিত। ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মাওলানা সাঈদীকে যুদ্ধাপরাধ মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ মামলা সাজানো হয়েছে মিথ্যা দিয়ে। মূলত তাঁর জনপ্রিয়তাকেই সরকার অপরাধ হিসেবে নিয়েছে। আরেকটি কথা উঠেছে, মাওলানাা সাঈদীর ওয়াজ শুনে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছেন। এটাও তাঁর একটা অপরাধ এবং সাঈদীকে এ কারণে প্রতিবেশী ভারতও সহ্য করতে পারে না। যা-ই হোক, মাওলানা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই মেনে নিতে পারেনি এবং এজন্য প্রচণ্ড প্রতিবাদ চলছে দেশজুড়েই।
এমন একটি নাজুক সময়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এলেন। দুঃখজনক হচ্ছে, তাঁকে যেভাবে সম্মান জানানো দরকার ছিল, সেই সম্মান আমরা জানাতে পারিনি। তাঁকে সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে নাগরিক সংবর্ধনা জানানো সম্ভব হয়নি। পার্লামেন্টে তাঁর ভাষণ দেয়ার কথা ছিল। সফররত একজন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এটা একটা বড় সম্মান। কিন্তু পার্লামেন্টে বিরোধী দল না থাকায় অর্থাত্ একদলীয় পার্লামেন্ট হওয়ায় তাঁর ভাষণটি তিনি দেননি। তাঁর সফরের দিনে হরতাল পড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার কারণে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে পারেননি। প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে আসার আগেই খালেদা জিয়া তার সাক্ষাত্ অনুষ্ঠানটি বাতিল করেন। তেমনি অনেক রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবীও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে পারেননি।
আগেই বলেছি, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রণব মুখার্জির এটাই প্রথম বিদেশ সফর। ভারতের রাষ্ট্রপতির বিদেশ সফর ঘনঘন হয় না। সেক্ষেত্রে প্রণব মুখার্জি যখন প্রথম সফর হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিলেন, তখন আমরা ধরেই নিতে পারি বাংলাদেশকে ভালোবেসে এবং সুসম্পর্ক স্থাপনের আগ্রহের কারণেই তিনি প্রথমে এদেশে আসতে চেয়েছেন। ইতোপূর্বে প্রণব মুখার্জি অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, কোনো বিশেষ দল নয়—বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককেই বড় করে দেখে ভারত। খালেদা জিয়ার দিল্লি সফরের সময়েও প্রণব মুখার্জিসহ অন্য নেতারাও ভারতের একই দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানান। তবে এবার যে পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এলেন, তাকে ওই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজমান, তাতে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানেরই সফরে আসার পরিবেশ নেই এবং কথাও নয়। সেখানে প্রণব মুখার্জি তাঁর সফরটি বাতিল বা স্থগিত না করে বাংলাদেশে আসায় এ বার্তাই দেয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জন্য ভারতের কংগ্রেস সরকারের রয়েছে অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা এ সফর নিয়ে লিখেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রণব মুখার্জি যদি বাংলাদেশে না যেতেন, তাহলে মৌলবাদীদের উত্সাহিত করা হতো। অর্থাত্ প্রণব মুখার্জির সফরে ভারতের একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য যে রয়েছে তা আনন্দবাজার ইঙ্গিত দিয়েছে।
অবশ্য বাস্তবে সফরটি যে সুখকর হয়নি, ভারতের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জি নিজেও উপলব্ধি করতে পেরেছেন। সফর শুরুর আগে দিল্লিতে বসেই তিনি জানতে পারেন বাংলাদেশে হরতাল চলছে, সরকারের পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে এবং বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ অনুষ্ঠান বাতিল করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্ বাতিলের খবরটি যখন প্রণব মুখার্জিকে জানানো হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায়। তবু তিনি সফরটি বাতিল করেননি। বাংলাদেশে আসার পর বাস্তব অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। রেডিও-টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকায় পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র পেয়েছেন। তিনি মনে মনে উপলব্ধি করেছেন তাঁর আসাটা হয়তো ভুলই হয়েছে। তাঁর এ অনুভূতি তিনি প্রকাশও করেছেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। বৈঠকে উপস্থিত জাপার একজন নেতার কাছ থেকে জানা গেছে, প্রণব মুখার্জি বলেছেন, এত হত্যাকাণ্ড দেশটিকে বড় সমস্যায় ফেলে দেবে। পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য আগামী নির্বাচনটি যাতে সব দলের অংশগ্রহণে হতে পারে, সেটাই ভারত চায় বলে জানিয়েছেন প্রণব মুখার্জি। তেমনি আনন্দবাজার লিখেছে, রাশেদ খান মেনন ও ইনুর সঙ্গে বৈঠকেও তিনি তাদের কাছে জানতে চান এত প্রাণহানি, হিংসা ও লাগাতার হরতালে কোথায় চলেছে বাংলাদেশ।
প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক বাতিলের খবরটি ভারতীয় মিডিয়ায় ব্যাপক গুরুত্ব পায়। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, হরতাল-সহিংসতার কারণে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বৈঠক বাতিল করেছেন খালেদা জিয়া। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্ বাতিল প্রণবের বিদেশ সফরের ওপর ছায়া ফেলেছে। প্রণব মুখার্জি যেদিন বাংলাদেশে যাবেন, সেদিন হরতাল এবং অন্তত ২৪ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। আবার প্রণব যেদিন বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন, সেদিনও হরতাল।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে আসবেন না বলে আমাদের জানিয়েছেন, ব্যস। এর বেশিকিছু বলা আমাদের শোভা পায় না।’
খালেদা জিয়া কেন প্রণবের সঙ্গে সাক্ষাত্ বাতিল করলেন, এ নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কিছু না বললেও বাংলাদেশের কোনো কোনো মহল এ নিয়ে হৈচৈ শুরু করে দিয়েছে। এ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সবচেয়ে সোচ্চার। সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি বলেছেন, এটা নাকি জাতির দুর্ভাগ্য। খালেদা জিয়া নাকি কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছেন। কিছু মিডিয়ায় কেউ কেউ এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। গণহত্যার প্রতিবাদে একটি রাজনৈতিক দলের হরতাল চলছে। বিএনপি নিজেও একদিন হরতাল ডেকেছে। এ অবস্থায় খালেদা জিয়া কি গাড়ি নিয়ে হরতাল ভেঙে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে পারেন? তিনি বিরোধীদলীয় নেতা। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। এ প্রতিবাদ উপেক্ষা করে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে খালেদা জিয়ার পক্ষে কি হরতাল ভাঙা সম্ভব? কিংবা সাজে? যেখানে পুলিশ-বিজিবি গুলি করে পাখির মতো মানুষ খুন করছে, খৈ ফোটার মতো ককটেল বিস্ফোরিত হচ্ছে, যানবাহন ভাংচুর ও পুড়ছে—সেখানে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার বিষয়টি কি বিবেচনায় আনা হবে না? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় দেখা যায় অনেক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা কি শুধু বিরোধী দলই ঘটায়? অনেক ঘটনা তো সরকারই ঘটিয়ে থাকে। সরকারের এজেন্সির লোকেরা কি চুপ থাকে? তারা কি অনেক ঘটনা ঘটিয়ে পরিস্থিতি নাজুক করে দেয় না? শাসক দলের ক্যাডাররা জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধে হাতে রাম দা, চাইনিজ কুড়াল আর পিস্তল-রিভলবার হাতে কুমিল্লায় কী কাণ্ড ঘটিয়েছে, পত্র-পত্রিকায় তা কি ছাপা হয়নি?
হরতাল ভেঙে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে না যাওয়ায় খালেদা জিয়ার সমালোচনা করেছেন অনেকে। খালেদা জিয়া যদি যেতেন, তাহলে আপনাদের ভূমিকা কী হতো? আরও একশ’গুণ বেশি সমালোচনায় কি মুখর হতেন না? আপনারা কি বলতেন না বিরোধীদলীয় নেতা হয়ে খালেদা জিয়া নিজেই হরতাল ভেঙেছেন। জনগণকে একদিকে তিনি জিম্মি করেছেন, অন্যদিকে নিজে হরতাল ভেঙেছেন। এ সমালোচনা কি করতেন না? তাই খালেদা জিয়া যা করেছেন ভেবে-চিন্তেই করেছেন। হুট করে তো তিনি ওই সাক্ষাত্ বাতিল করেননি। কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনেই তিনি তা করেছেন। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে আসার আগেই ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি সাক্ষাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। বরং এ ঘটনার পর প্রণব মুখার্জি যদি সফর বাতিল করতেন, তাহলে সেটা হতো তাঁর জন্য একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণকে তখন গুরুত্ব দেয়া হতো। আর প্রণব মুখার্জি নিজেও বাংলাদেশে অনেক সম্মানিত হতেন। আনন্দবাজার লিখেছে, ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান বিশেষ বিমানে সাংবাদিকরা তাকে খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্ নিয়ে প্রশ্ন করতেই প্রণব মুখার্জির কপালে ভাজ লক্ষ্য করা যায়। শুধু বললেন, আমি তো তাকে সময় দিয়েছিলাম। এটা অসৌজন্য কিনা, প্রশ্ন করলে তিনি আর কোনো জবাব দেননি।
রক্তাক্ত বাংলাদেশে শেখ হাসিনার দম্ভোক্তি
গোটা বাংলাদেশ এখন অগ্নিগর্ভ। একদিকে মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির বিতর্কিত রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মানুষ বিক্ষুব্ধ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় গণহত্যা ও মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় মানুষ স্তম্ভিত। টানা তিনদিন হরতালের একদিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার আবার একটি হরতাল হয়েছে। আজ জুমা নামাজের পর দেশের আলেম সমাজ ও তৌহিদি জনতা শাহবাগি নাস্তিক-মুরতাদদের বিচারের দাবিতে মিছিল করবেন। কাল বিরোধী দলের গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি রয়েছে। পুলিশ যদি গায়েবানা জানাজায় বাধা দেয় কিংবা বুধবারের মতো গুলি চালায়, তাহলে হয়তো রোববার থেকে আবারও হরতাল ডাকা হতে পারে। ইতোমধ্যে বুধবার রাতে ১৮ দলীয় জোটের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে এ সরকারের প্রতি অনাস্থা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এ সরকার একটি খুনি সরকার। এর আগে সংবাদ সম্মেলন করে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারকে হুশিয়ার করে বলেছেন, গণহত্যার পরিণাম হবে ভয়াবহ। সরকারকে রক্তপিপাসু খুনি আখ্যায়িত করে তিনি অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। ১৮ দলীয় জোটের সভায় সরকার পতনের একদফা আন্দোলনেরও মোটামুটি সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এক কথায় বাংলাদেশ এখন অশান্ত। রক্তাক্ত বাংলাদেশ।
মাওলানা সাঈদীর রায়ের পর প্রতিবাদ বিক্ষোভে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা। সরকারের নির্দেশেই পুলিশ, বিজিবি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। কিছুদিন আগে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন পুলিশকে, দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া হওয়ায় তিনি আবার তা অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বেনজীর আহমেদ আসলেই সেটা বলেছিলেন। পুলিশ দেখামাত্রই গুলি করছে। পুলিশের গুলিতে হত্যার ঘটনা এত বেড়ে গেছে যে, স্বাধীনতার পর এর নজির নেই। গত আট দিনে দেশে রাষ্ট্রীয় গণহত্যার শিকার হয়েছেন ১০২ জন মানুষ। এ হিসাব আমার দেশ-এর। টেলিভিশনের টকশোগুলোতে বলা হচ্ছে গণহত্যার শিকার হয়েছে ৮৩ জন। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর ৫ মার্চ দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ৯৮ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে যা স্বাধীনতার পর দেশের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ঘটনা। জামায়াতে ইসলামীর দাবি ১৪৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ৫ মার্চ সংসদে একটি বিবৃতি দেন। তিনি জানান, ৭ পুলিশসহ ৬৭ জন নিহত হয়েছে। তবু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাকি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের পুরো দায় চাপান জামায়াত-শিবিরের ওপর। বলেন, হতাহত ও সম্পদহানির পুরো দায় জামায়াত-শিবিরের নেতাদেরই নিতে হবে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রশংসনীয় কাজ করেছে বলেও তিনি তাদের সার্টিফিকেট দেন। ফলে পুলিশ আরও দ্বিগুণ বীরত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রতিবাদী মানুষের ওপর। বুধবার পুলিশ বিরোধী দল বিএনপির মিছিলে বেপরোয়া গুলি চালিয়ে মিছিল ভেঙে দেয়। গুলি চালিয়ে ভেঙে দেয় জামায়াতে ইসলামীর মিছিল। এর আগেও শান্তিনগর-মালিবাগে বিএনপির মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলি চালায় গত শুক্রবার তৌহিদি জনতার মিছিলেও।
পুলিশের গুলি করার নেশা এখন এতই পেয়ে বসেছে যে, গুলি ছাড়া তারা যেন আর কিছুই বোঝে না। আগে মিছিলে লাঠিচার্জ করা হতো; কিন্তু এখন পুলিশের হাত থেকে লাঠি উধাও হয়ে গেছে। লাঠিচার্জের স্থান দখল করে নিয়েছে গুলি। শুধু রাবার বুলেটই নয়, যে গুলিতে প্রাণ যায় সে গুলিই চালাচ্ছে। দেশব্যাপী মানুষের মুখে মুখে রব উঠেছে একাত্তরকেও হার মানাচ্ছে পুলিশের গুলিবর্ষণ। একাত্তরে পাক হানাদাররা যেভাবে গুলি করত, এখন স্বাধীন দেশের পুলিশ একইভাবে গুলি করছে। মিছিল বের করামাত্রই গুলি করে দিচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত প্রতিবাদ হিসেবে ঘনঘন হরতালও হচ্ছে। দেশব্যাপী রাজপথ-রেলপথ অবরোধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। অচল হয়ে পড়েছে বন্দর। রেলে এক সপ্তাহে ৬০টির মতো নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ে স্টেশন, ইঞ্জিন ও ট্রেনের বগি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রেললাইনের ফিশপ্লেট উত্পাটন, সেতু ও স্লিপারে আগুন দেয়া হচ্ছে। একইভাবে গাছের গুঁড়ি ফেলে মহাসড়ক অবরোধ করা হচ্ছে। প্রশাসন আতঙ্কগ্রস্ত। ইতোমধ্যে আতঙ্কগ্রস্ত মাঠপর্যায়ের প্রশাসন নিরাপত্তা চেয়ে সচিবালয়ে চিঠি দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন ৪০ জন জেলা প্রশাসক। বিজিবি, র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ফোর্স ও কিছু জায়গায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এমন একটি পরিস্থিতিতে সরকারের যখন অবস্থা সামাল দেয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল, তা না করে সরকার পরিস্থিতি ভিন্নখাতে নেয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন, হিন্দু মন্দির ও প্রতিভা ভাংচুর, শহীদ মিনার ভাংচুর, পতাকা পুড়িয়ে ফেলা ইত্যাদি নানা ইস্যু সৃষ্টি করছে সরকার। একদিকে ‘হিন্দু কার্ড’ খেলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো, অন্যদিকে শহীদ মিনার ভাঙা ও পতাকা পোড়ানোর কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে কিছু একটা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, এগুলোর সঙ্গে সরকারি দলের লোকজন জড়িত। বগুড়ার শেরপুরে শহীদ মিনার ভাঙার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছে যুবলীগ নেতা। তাকে থানায় নেয়ার পর ‘পাগল’ আখ্যায়িত করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। পাগল হলে যুবলীগ নেতা হয় কী করে? তেমনি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় বোমা বানানোর সময় নিহত হয়েছে আওয়ামী লীগের এক নেতা। আহতরাও আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতা। তেমনি গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রামে হিন্দুবাড়িতে আগুন এবং মূর্তি ভাংচুরের ঘটনায় আওয়ামী লীগ-যুবলীগ জড়িত থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়।
সরকার নিজেই এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কখনও দলের লোকদের দিয়ে করাচ্ছে, আবার কখনও এজেন্সির লোকদের দিয়ে। সরকারি উসকানি পেয়ে শাসক দলের ক্যাডাররা যেমন বেপরোয়া, তেমনি বেপরোয়া পুলিশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের বাহবা দিচ্ছেন। মিছিলের ক্ষেত্রেই দেখুন, বিরোধী দল মিছিল করলে নির্বিচারে গুলি; কিন্তু সরকারি দলের লোকজন মিছিল করলে শুধু নিরাপত্তাই নয়, জায়গা করে দেয়া হচ্ছে। বুধবার বিএনপির হরতালের দিন প্রেস ক্লাবের সামনের পুরো রাজপথে যুবলীগ-যুবমৈত্রী, যুব সংগ্রাম সমাবেশ করে। পুলিশ পল্টন পুলিশ বক্স, জিরো পয়েন্ট এবং কদম ফোয়ারার কাছে যানবাহন আটকে দেয়। তারা নির্বিঘ্নে সমাবেশ করে। তেমনি এক মাস ধরে শাহবাগিরা শাহবাগ চত্বর বন্ধ করে সমাবেশ করছে। পুলিশ মত্স্য ভবন মোড়, কাঁটাবন মোড়, শেরাটন মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা ডাইভারশন করে তাদের সমাবেশ করতে দিচ্ছে। সমাবেশে নিরাপত্তা দিচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রস্রাব-পায়খানার জন্য মোবাইল টয়লেট সাপ্লাই করা হচ্ছে। শাহবাগি নেতাদের বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে প্রতিদিন আপ্যায়ন করা হচ্ছে। পাঁচতারা হোটেলে রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে বারডেম হাসপাতাল, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল, পিজি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীরা পোহাচ্ছেন চরম দুর্ভোগ। এভাবে শাহবাগিদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার সুযোগ দিয়েছে সরকারই। নৈরাজ্য উসকে দিয়েছে সরকারই। এত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে, রক্তের হোলি খেলে আসলে রাজনৈতিক ফায়দাই হাসিল করছে সরকার।
গত বুধবার সংসদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দম্ভোক্তি করেছেন— ‘আমি যে পদক্ষেপ নিই, তাতে কখনও ব্যর্থ হই না।’ অর্থাত্ গুলি চালাব, মানুষ মারব, নৈরাজ্য সৃষ্টি করব—আমার প্রয়োজনে সবকিছু আমি করব। আবার হত্যাকাণ্ড, সম্পদহানির দায় নাকি নিতে হবে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায় চাপিয়েছেন জামায়াত-শিবিরের ওপর আর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ওপর। কী বিচিত্র এ দেশ!
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট
abdal62@gmail.com
প্রণব মুখার্জি প্রতিবেশী ভারতের মতো বিশাল একটি দেশের শুধু রাষ্ট্রপতিই নন, তিনি দেশটির প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি। শিক্ষকতায় তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ভারতখ্যাত একজন রাজনীতিবিদ। তাঁর মতো প্রশাসনিক ও পার্লামেন্টারি অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদটি এর আগে কেউ অলঙ্কৃত করেননি। তিনি ভারতের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন। পাঁচবার তিনি ছিলেন রাজ্যসভার সদস্য এবং ২০০৪ সাল থেকে লোকসভার সদস্য। একইভাবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটিতে আছেন। ৭৮ বছর বয়সের এই রাজনীতিবিদ ২০১২ সালের ২৫ জুলাই ভারতের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। প্রণব মুখার্জি আমাদের অত্যন্ত কাছের একজন মানুষ। বলা যায় বাংলাদেশের একজন পরম আত্মীয়। বাংলাদেশের নড়াইলে তাঁর শ্বশুরবাড়ি।
এমন একজন মানুষ যখন বাংলাদেশে বেড়াতে আসবেন সেটা নিঃসন্দেহে আমাদের সবার কাছে খুশির খবর। আমরা তাঁকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানাব, কাছে টেনে নেব, তাঁর কথা শুনে এবং সাহচর্যে মুগ্ধ হবো। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, তাঁর এই সফরে আমরা খুশি হতে পারিনি। এটা ঠিক যে, তাঁর এ সফরটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা ও বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানিত করার জন্য বাংলাদেশের আমন্ত্রণেই ছিল তাঁর সফর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে তাঁর এ সফরে দোষের কিছুই ছিল না। দোষের যে কারণ তা হচ্ছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রণব মুখার্জিকে স্বাগত জানানোর জন্য দেশে একটি নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। প্রণব মুখার্জির সফরের ঠিক কয়েকদিন আগে হঠাত্ করেই মাওলানা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। অনেকের ধারণা ছিল, রায় ঘোষণা হবে প্রণব মুখার্জির সফরের পর। কিন্তু দেখা গেল ট্রাইব্যুনাল হঠাত্ করে ঘোষণা দেয় যে, কাল সাঈদীর রায়। ফলে রায় ঘোষণার পর মুহূর্তের মধ্যে সারা বাংলাদেশ বারুদের মতো জ্বলে ওঠে।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এদেশের জনপ্রিয় একজন আলেমে দ্বীন। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি শুধু বাংলাদেশেই নন, বিশ্বময় কোরআনের আলো ছড়িয়েছেন। ইসলাম, মহানবী (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, নামাজ-রোজা, হজ, জাকাত এবং ঈমান সম্পর্কে মানুষকে আলোকিত করেছেন। যেখানে যেদিন তাঁর মাহফিল বা ওয়াজ থাকত, সেখানে তাঁর কথা শোনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত মানুষ। দেশ-বিদেশে আকাশচুম্বী জনপ্রিয় এ আলেমকে সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মিথ্যা অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করে। দেশব্যাপী মানুষের প্রচণ্ড প্রতিবাদই প্রমাণ করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও ফাঁসির রায়টি চরম বিতর্কিত। ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মাওলানা সাঈদীকে যুদ্ধাপরাধ মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ মামলা সাজানো হয়েছে মিথ্যা দিয়ে। মূলত তাঁর জনপ্রিয়তাকেই সরকার অপরাধ হিসেবে নিয়েছে। আরেকটি কথা উঠেছে, মাওলানাা সাঈদীর ওয়াজ শুনে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছেন। এটাও তাঁর একটা অপরাধ এবং সাঈদীকে এ কারণে প্রতিবেশী ভারতও সহ্য করতে পারে না। যা-ই হোক, মাওলানা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই মেনে নিতে পারেনি এবং এজন্য প্রচণ্ড প্রতিবাদ চলছে দেশজুড়েই।
এমন একটি নাজুক সময়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এলেন। দুঃখজনক হচ্ছে, তাঁকে যেভাবে সম্মান জানানো দরকার ছিল, সেই সম্মান আমরা জানাতে পারিনি। তাঁকে সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে নাগরিক সংবর্ধনা জানানো সম্ভব হয়নি। পার্লামেন্টে তাঁর ভাষণ দেয়ার কথা ছিল। সফররত একজন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এটা একটা বড় সম্মান। কিন্তু পার্লামেন্টে বিরোধী দল না থাকায় অর্থাত্ একদলীয় পার্লামেন্ট হওয়ায় তাঁর ভাষণটি তিনি দেননি। তাঁর সফরের দিনে হরতাল পড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার কারণে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে পারেননি। প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে আসার আগেই খালেদা জিয়া তার সাক্ষাত্ অনুষ্ঠানটি বাতিল করেন। তেমনি অনেক রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবীও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে পারেননি।
আগেই বলেছি, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রণব মুখার্জির এটাই প্রথম বিদেশ সফর। ভারতের রাষ্ট্রপতির বিদেশ সফর ঘনঘন হয় না। সেক্ষেত্রে প্রণব মুখার্জি যখন প্রথম সফর হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিলেন, তখন আমরা ধরেই নিতে পারি বাংলাদেশকে ভালোবেসে এবং সুসম্পর্ক স্থাপনের আগ্রহের কারণেই তিনি প্রথমে এদেশে আসতে চেয়েছেন। ইতোপূর্বে প্রণব মুখার্জি অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, কোনো বিশেষ দল নয়—বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককেই বড় করে দেখে ভারত। খালেদা জিয়ার দিল্লি সফরের সময়েও প্রণব মুখার্জিসহ অন্য নেতারাও ভারতের একই দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানান। তবে এবার যে পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এলেন, তাকে ওই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজমান, তাতে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানেরই সফরে আসার পরিবেশ নেই এবং কথাও নয়। সেখানে প্রণব মুখার্জি তাঁর সফরটি বাতিল বা স্থগিত না করে বাংলাদেশে আসায় এ বার্তাই দেয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জন্য ভারতের কংগ্রেস সরকারের রয়েছে অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা এ সফর নিয়ে লিখেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রণব মুখার্জি যদি বাংলাদেশে না যেতেন, তাহলে মৌলবাদীদের উত্সাহিত করা হতো। অর্থাত্ প্রণব মুখার্জির সফরে ভারতের একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য যে রয়েছে তা আনন্দবাজার ইঙ্গিত দিয়েছে।
অবশ্য বাস্তবে সফরটি যে সুখকর হয়নি, ভারতের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জি নিজেও উপলব্ধি করতে পেরেছেন। সফর শুরুর আগে দিল্লিতে বসেই তিনি জানতে পারেন বাংলাদেশে হরতাল চলছে, সরকারের পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে এবং বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ অনুষ্ঠান বাতিল করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্ বাতিলের খবরটি যখন প্রণব মুখার্জিকে জানানো হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায়। তবু তিনি সফরটি বাতিল করেননি। বাংলাদেশে আসার পর বাস্তব অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। রেডিও-টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকায় পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র পেয়েছেন। তিনি মনে মনে উপলব্ধি করেছেন তাঁর আসাটা হয়তো ভুলই হয়েছে। তাঁর এ অনুভূতি তিনি প্রকাশও করেছেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। বৈঠকে উপস্থিত জাপার একজন নেতার কাছ থেকে জানা গেছে, প্রণব মুখার্জি বলেছেন, এত হত্যাকাণ্ড দেশটিকে বড় সমস্যায় ফেলে দেবে। পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য আগামী নির্বাচনটি যাতে সব দলের অংশগ্রহণে হতে পারে, সেটাই ভারত চায় বলে জানিয়েছেন প্রণব মুখার্জি। তেমনি আনন্দবাজার লিখেছে, রাশেদ খান মেনন ও ইনুর সঙ্গে বৈঠকেও তিনি তাদের কাছে জানতে চান এত প্রাণহানি, হিংসা ও লাগাতার হরতালে কোথায় চলেছে বাংলাদেশ।
প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক বাতিলের খবরটি ভারতীয় মিডিয়ায় ব্যাপক গুরুত্ব পায়। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, হরতাল-সহিংসতার কারণে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বৈঠক বাতিল করেছেন খালেদা জিয়া। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্ বাতিল প্রণবের বিদেশ সফরের ওপর ছায়া ফেলেছে। প্রণব মুখার্জি যেদিন বাংলাদেশে যাবেন, সেদিন হরতাল এবং অন্তত ২৪ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। আবার প্রণব যেদিন বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন, সেদিনও হরতাল।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে আসবেন না বলে আমাদের জানিয়েছেন, ব্যস। এর বেশিকিছু বলা আমাদের শোভা পায় না।’
খালেদা জিয়া কেন প্রণবের সঙ্গে সাক্ষাত্ বাতিল করলেন, এ নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কিছু না বললেও বাংলাদেশের কোনো কোনো মহল এ নিয়ে হৈচৈ শুরু করে দিয়েছে। এ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সবচেয়ে সোচ্চার। সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি বলেছেন, এটা নাকি জাতির দুর্ভাগ্য। খালেদা জিয়া নাকি কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছেন। কিছু মিডিয়ায় কেউ কেউ এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। গণহত্যার প্রতিবাদে একটি রাজনৈতিক দলের হরতাল চলছে। বিএনপি নিজেও একদিন হরতাল ডেকেছে। এ অবস্থায় খালেদা জিয়া কি গাড়ি নিয়ে হরতাল ভেঙে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে পারেন? তিনি বিরোধীদলীয় নেতা। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। এ প্রতিবাদ উপেক্ষা করে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে খালেদা জিয়ার পক্ষে কি হরতাল ভাঙা সম্ভব? কিংবা সাজে? যেখানে পুলিশ-বিজিবি গুলি করে পাখির মতো মানুষ খুন করছে, খৈ ফোটার মতো ককটেল বিস্ফোরিত হচ্ছে, যানবাহন ভাংচুর ও পুড়ছে—সেখানে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার বিষয়টি কি বিবেচনায় আনা হবে না? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় দেখা যায় অনেক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা কি শুধু বিরোধী দলই ঘটায়? অনেক ঘটনা তো সরকারই ঘটিয়ে থাকে। সরকারের এজেন্সির লোকেরা কি চুপ থাকে? তারা কি অনেক ঘটনা ঘটিয়ে পরিস্থিতি নাজুক করে দেয় না? শাসক দলের ক্যাডাররা জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধে হাতে রাম দা, চাইনিজ কুড়াল আর পিস্তল-রিভলবার হাতে কুমিল্লায় কী কাণ্ড ঘটিয়েছে, পত্র-পত্রিকায় তা কি ছাপা হয়নি?
হরতাল ভেঙে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে না যাওয়ায় খালেদা জিয়ার সমালোচনা করেছেন অনেকে। খালেদা জিয়া যদি যেতেন, তাহলে আপনাদের ভূমিকা কী হতো? আরও একশ’গুণ বেশি সমালোচনায় কি মুখর হতেন না? আপনারা কি বলতেন না বিরোধীদলীয় নেতা হয়ে খালেদা জিয়া নিজেই হরতাল ভেঙেছেন। জনগণকে একদিকে তিনি জিম্মি করেছেন, অন্যদিকে নিজে হরতাল ভেঙেছেন। এ সমালোচনা কি করতেন না? তাই খালেদা জিয়া যা করেছেন ভেবে-চিন্তেই করেছেন। হুট করে তো তিনি ওই সাক্ষাত্ বাতিল করেননি। কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনেই তিনি তা করেছেন। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে আসার আগেই ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি সাক্ষাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। বরং এ ঘটনার পর প্রণব মুখার্জি যদি সফর বাতিল করতেন, তাহলে সেটা হতো তাঁর জন্য একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণকে তখন গুরুত্ব দেয়া হতো। আর প্রণব মুখার্জি নিজেও বাংলাদেশে অনেক সম্মানিত হতেন। আনন্দবাজার লিখেছে, ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান বিশেষ বিমানে সাংবাদিকরা তাকে খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্ নিয়ে প্রশ্ন করতেই প্রণব মুখার্জির কপালে ভাজ লক্ষ্য করা যায়। শুধু বললেন, আমি তো তাকে সময় দিয়েছিলাম। এটা অসৌজন্য কিনা, প্রশ্ন করলে তিনি আর কোনো জবাব দেননি।
রক্তাক্ত বাংলাদেশে শেখ হাসিনার দম্ভোক্তি
গোটা বাংলাদেশ এখন অগ্নিগর্ভ। একদিকে মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির বিতর্কিত রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মানুষ বিক্ষুব্ধ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় গণহত্যা ও মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় মানুষ স্তম্ভিত। টানা তিনদিন হরতালের একদিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার আবার একটি হরতাল হয়েছে। আজ জুমা নামাজের পর দেশের আলেম সমাজ ও তৌহিদি জনতা শাহবাগি নাস্তিক-মুরতাদদের বিচারের দাবিতে মিছিল করবেন। কাল বিরোধী দলের গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি রয়েছে। পুলিশ যদি গায়েবানা জানাজায় বাধা দেয় কিংবা বুধবারের মতো গুলি চালায়, তাহলে হয়তো রোববার থেকে আবারও হরতাল ডাকা হতে পারে। ইতোমধ্যে বুধবার রাতে ১৮ দলীয় জোটের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে এ সরকারের প্রতি অনাস্থা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এ সরকার একটি খুনি সরকার। এর আগে সংবাদ সম্মেলন করে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারকে হুশিয়ার করে বলেছেন, গণহত্যার পরিণাম হবে ভয়াবহ। সরকারকে রক্তপিপাসু খুনি আখ্যায়িত করে তিনি অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। ১৮ দলীয় জোটের সভায় সরকার পতনের একদফা আন্দোলনেরও মোটামুটি সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এক কথায় বাংলাদেশ এখন অশান্ত। রক্তাক্ত বাংলাদেশ।
মাওলানা সাঈদীর রায়ের পর প্রতিবাদ বিক্ষোভে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা। সরকারের নির্দেশেই পুলিশ, বিজিবি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। কিছুদিন আগে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন পুলিশকে, দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া হওয়ায় তিনি আবার তা অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বেনজীর আহমেদ আসলেই সেটা বলেছিলেন। পুলিশ দেখামাত্রই গুলি করছে। পুলিশের গুলিতে হত্যার ঘটনা এত বেড়ে গেছে যে, স্বাধীনতার পর এর নজির নেই। গত আট দিনে দেশে রাষ্ট্রীয় গণহত্যার শিকার হয়েছেন ১০২ জন মানুষ। এ হিসাব আমার দেশ-এর। টেলিভিশনের টকশোগুলোতে বলা হচ্ছে গণহত্যার শিকার হয়েছে ৮৩ জন। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর ৫ মার্চ দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ৯৮ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে যা স্বাধীনতার পর দেশের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ঘটনা। জামায়াতে ইসলামীর দাবি ১৪৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ৫ মার্চ সংসদে একটি বিবৃতি দেন। তিনি জানান, ৭ পুলিশসহ ৬৭ জন নিহত হয়েছে। তবু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাকি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের পুরো দায় চাপান জামায়াত-শিবিরের ওপর। বলেন, হতাহত ও সম্পদহানির পুরো দায় জামায়াত-শিবিরের নেতাদেরই নিতে হবে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রশংসনীয় কাজ করেছে বলেও তিনি তাদের সার্টিফিকেট দেন। ফলে পুলিশ আরও দ্বিগুণ বীরত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রতিবাদী মানুষের ওপর। বুধবার পুলিশ বিরোধী দল বিএনপির মিছিলে বেপরোয়া গুলি চালিয়ে মিছিল ভেঙে দেয়। গুলি চালিয়ে ভেঙে দেয় জামায়াতে ইসলামীর মিছিল। এর আগেও শান্তিনগর-মালিবাগে বিএনপির মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলি চালায় গত শুক্রবার তৌহিদি জনতার মিছিলেও।
পুলিশের গুলি করার নেশা এখন এতই পেয়ে বসেছে যে, গুলি ছাড়া তারা যেন আর কিছুই বোঝে না। আগে মিছিলে লাঠিচার্জ করা হতো; কিন্তু এখন পুলিশের হাত থেকে লাঠি উধাও হয়ে গেছে। লাঠিচার্জের স্থান দখল করে নিয়েছে গুলি। শুধু রাবার বুলেটই নয়, যে গুলিতে প্রাণ যায় সে গুলিই চালাচ্ছে। দেশব্যাপী মানুষের মুখে মুখে রব উঠেছে একাত্তরকেও হার মানাচ্ছে পুলিশের গুলিবর্ষণ। একাত্তরে পাক হানাদাররা যেভাবে গুলি করত, এখন স্বাধীন দেশের পুলিশ একইভাবে গুলি করছে। মিছিল বের করামাত্রই গুলি করে দিচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত প্রতিবাদ হিসেবে ঘনঘন হরতালও হচ্ছে। দেশব্যাপী রাজপথ-রেলপথ অবরোধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। অচল হয়ে পড়েছে বন্দর। রেলে এক সপ্তাহে ৬০টির মতো নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ে স্টেশন, ইঞ্জিন ও ট্রেনের বগি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রেললাইনের ফিশপ্লেট উত্পাটন, সেতু ও স্লিপারে আগুন দেয়া হচ্ছে। একইভাবে গাছের গুঁড়ি ফেলে মহাসড়ক অবরোধ করা হচ্ছে। প্রশাসন আতঙ্কগ্রস্ত। ইতোমধ্যে আতঙ্কগ্রস্ত মাঠপর্যায়ের প্রশাসন নিরাপত্তা চেয়ে সচিবালয়ে চিঠি দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন ৪০ জন জেলা প্রশাসক। বিজিবি, র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ফোর্স ও কিছু জায়গায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এমন একটি পরিস্থিতিতে সরকারের যখন অবস্থা সামাল দেয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল, তা না করে সরকার পরিস্থিতি ভিন্নখাতে নেয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন, হিন্দু মন্দির ও প্রতিভা ভাংচুর, শহীদ মিনার ভাংচুর, পতাকা পুড়িয়ে ফেলা ইত্যাদি নানা ইস্যু সৃষ্টি করছে সরকার। একদিকে ‘হিন্দু কার্ড’ খেলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো, অন্যদিকে শহীদ মিনার ভাঙা ও পতাকা পোড়ানোর কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে কিছু একটা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, এগুলোর সঙ্গে সরকারি দলের লোকজন জড়িত। বগুড়ার শেরপুরে শহীদ মিনার ভাঙার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছে যুবলীগ নেতা। তাকে থানায় নেয়ার পর ‘পাগল’ আখ্যায়িত করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। পাগল হলে যুবলীগ নেতা হয় কী করে? তেমনি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় বোমা বানানোর সময় নিহত হয়েছে আওয়ামী লীগের এক নেতা। আহতরাও আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতা। তেমনি গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রামে হিন্দুবাড়িতে আগুন এবং মূর্তি ভাংচুরের ঘটনায় আওয়ামী লীগ-যুবলীগ জড়িত থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়।
সরকার নিজেই এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কখনও দলের লোকদের দিয়ে করাচ্ছে, আবার কখনও এজেন্সির লোকদের দিয়ে। সরকারি উসকানি পেয়ে শাসক দলের ক্যাডাররা যেমন বেপরোয়া, তেমনি বেপরোয়া পুলিশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের বাহবা দিচ্ছেন। মিছিলের ক্ষেত্রেই দেখুন, বিরোধী দল মিছিল করলে নির্বিচারে গুলি; কিন্তু সরকারি দলের লোকজন মিছিল করলে শুধু নিরাপত্তাই নয়, জায়গা করে দেয়া হচ্ছে। বুধবার বিএনপির হরতালের দিন প্রেস ক্লাবের সামনের পুরো রাজপথে যুবলীগ-যুবমৈত্রী, যুব সংগ্রাম সমাবেশ করে। পুলিশ পল্টন পুলিশ বক্স, জিরো পয়েন্ট এবং কদম ফোয়ারার কাছে যানবাহন আটকে দেয়। তারা নির্বিঘ্নে সমাবেশ করে। তেমনি এক মাস ধরে শাহবাগিরা শাহবাগ চত্বর বন্ধ করে সমাবেশ করছে। পুলিশ মত্স্য ভবন মোড়, কাঁটাবন মোড়, শেরাটন মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা ডাইভারশন করে তাদের সমাবেশ করতে দিচ্ছে। সমাবেশে নিরাপত্তা দিচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রস্রাব-পায়খানার জন্য মোবাইল টয়লেট সাপ্লাই করা হচ্ছে। শাহবাগি নেতাদের বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে প্রতিদিন আপ্যায়ন করা হচ্ছে। পাঁচতারা হোটেলে রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে বারডেম হাসপাতাল, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল, পিজি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীরা পোহাচ্ছেন চরম দুর্ভোগ। এভাবে শাহবাগিদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার সুযোগ দিয়েছে সরকারই। নৈরাজ্য উসকে দিয়েছে সরকারই। এত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে, রক্তের হোলি খেলে আসলে রাজনৈতিক ফায়দাই হাসিল করছে সরকার।
গত বুধবার সংসদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দম্ভোক্তি করেছেন— ‘আমি যে পদক্ষেপ নিই, তাতে কখনও ব্যর্থ হই না।’ অর্থাত্ গুলি চালাব, মানুষ মারব, নৈরাজ্য সৃষ্টি করব—আমার প্রয়োজনে সবকিছু আমি করব। আবার হত্যাকাণ্ড, সম্পদহানির দায় নাকি নিতে হবে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায় চাপিয়েছেন জামায়াত-শিবিরের ওপর আর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ওপর। কী বিচিত্র এ দেশ!
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট
abdal62@gmail.com


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া










