দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পুলিশ র্যাবের গুলি চলছে : সহিংসতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিহত ১ : ৪ মহিলা এমপি আটকের পর মুক্ত : দেরিতে গুলি করায় ২ পুলিশ প্রত্যাহার
স্টাফ রিপোর্টার
| পরের সংবাদ» |
বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, ভাংচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও পুলিশ-আওয়ামী লীগের আগ্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে গতকাল দেশজুড়ে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এলাকায় দিনভর তাণ্ডব চালায় পুলিশ। চারজন মহিলা এমপিকে সকালে আটক করার পর সন্ধ্যায় ছেড়ে দেয়া হয়। আটকের সময় এমপি শাম্মী আকতারকে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিলে তিনি মারাত্মক আহত হন। নয়াপল্টনে হরতালের সমর্থনে বের হওয়া মিছিলে গুলি করতে দেরি করায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। হরতালের সংবাদ ধারণ করায় বাসাবোতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। ছিনিয়ে নেয় টেলিভিশনের ক্যামেরা। হরতাল সমর্থকরা শতাধিক গাড়ি ভাংচুর করে। রাজধানীতে দু’শতাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। সমাবেশ-মিছিলে পুলিশের গুলির প্রতিবাদে ১৮ দলীয় জোট আহূত হরতালে দেশ অচল হয়ে পড়ে।
ঢাকার বাইরেও সহিংস ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে বিভিন্ন জেলায় হরতাল সমর্থনে মিছিল হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে হরতাল সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষে আওয়ামী লীগের এক কর্মী নিহত হয়। লাকসামে রেললাইনের স্লিপারে আগুন ধরিয়ে দেয় পিকেটাররা। গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, পাবনা, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ, মাগুরা, সীতাকুণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির মিছিলে বেধড়ক লাঠিচার্জ ও গুলি চালিয়েছে র্যাব-পুলিশ। এতে অনেক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কুমিল্লা, নরসিংদী ও মিরসরাইসহ অনেক জেলার মহাসড়ক অবরোধ করে পিকেটাররা। হরতাল প্রতিরোধে সারাদেশেই তাণ্ডব চালায় পুলিশ ও সরকারি দলের ক্যাডাররা। তাদের হামলায় আহত হন বিএনপি-জামায়াতের তিন শতাধিক নেতাকর্মী। শুধু বিএনপিরই দু’শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তবে ডিএমপি দাবি করেছে, গতকাল হরতালে ২৮ পিকেটারকে আটক করা হয়েছে। হরতালে রাজধানীতে দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ ছিল বন্ধ। নগরীতে কিছু বাস বের হলেও এ সংখ্যা ছিল সামান্য। দূরপাল্লার কোনো গাড়ি চলাচল করেনি। আন্তঃজেলা বাস সার্ভিস বন্ধ থাকায় বিচ্ছিন্ন ছিল জেলাগুলো।
হরতাল সফলভাবে পালন করায় জোটের নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ১৮ দলীয় জোট নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী হরতাল শেষে নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারপার্সনের পক্ষে এ অভিনন্দন জানান। পৃথকভাবে দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
হরতাল শেষে নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা না হলেও গত রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। ওই সভায় পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে বলে জানান রুহুল কবির রিজভী। তবে তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লড়াইয়ে বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিহত ১ : গতকাল হরতালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার পোলাডাঙ্গায় বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে আবদুর রহমান (২৬) নামে এক যুবলীগ কর্মী নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। নিহত আবদুর রহমান উপজেলার পোলাডাঙ্গা হাটখোলা গ্রামের দাউদ হোসেনের ছেলে। ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হরতালের সমর্থনে সকাল সাড়ে দশটার দিকে বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা পোলাডাঙ্গা হাটখোলা বাজার এলাকায় মিছিল বের করে। এ সময় হরতালে দোকান খোলা রাখাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। লাঠিসোটা, ধারালো অস্ত্র ও ইট-পাটকেল নিয়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে ৭-৮টি দোকান ও ২টি মোটরসাইকেল ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আগুন নেভানোর জন্য পার্শ্ববর্তী গোমস্তাপুর উপজেলা থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় দুপুরে ভোলাহাটের মুসরীভুজা এলাকায় পৌঁছলে হরতাল সমর্থকরা তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সংঘর্ষে আহত স্থানীয় যুবলীগকর্মী আবদুর রহমানকে ভোলাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পথে মারা যায়। এছাড়া সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়। তাদের স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ভোলাহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদ সোহরাওয়ার্দী জানান, সংঘর্ষের পর ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভোলাহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন আক্তার জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অবরুদ্ধ বিএনপি কার্যালয় : হরতাল ঠেকাতে বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে পুলিশের আগ্রাসী ভূমিকা আরও একধাপ এগিয়ে গেছে। গতকাল কার্যালয়ের মূল গেটও বন্ধ করে দেয় তারা। দলটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের নেতৃত্বে ৩০ জনের মতো বিএনপিকর্মী গেটে অবস্থান নিয়ে হরতালের পক্ষে স্লোগান দেয়। কিন্তু সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ সদস্যরা কার্যালয়ের গেটঘেঁষে দাড়ান এবং গেট বন্ধ করে দেন। সারাদিনে কার্যালয়ে কোনো নেতাকর্মী প্রবেশ করতে পারেনি। প্রবেশের চেষ্টা করলে চার মহিলা এমপিকে পুলিশ আটক করে। এমনকি কোনো ধরনের খাদ্যদ্রব্যও গেট থেকে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের জন্য নয়াপল্টন এলাকার একটি বাসা থেকে আসা দুপুরের খাবারের টিফিনবক্সটিও পুলিশ আটকে দেয়। বুধবার বিকাল থেকে অবস্থান নেয়া নেতাকর্মীরা বন্ধ গেটের ভেতরেই হরতালের পক্ষে স্লোগান দেন। এতে আরও ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ জনি, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, বেলাল আহমেদ, শাহজাহান সম্রাট, মহানগর নেতা এম এ হান্নানসহ বিএনপি ও অঙ্গদলের ৩০ জনের মতো নেতাকর্মী।
চার মহিলা এমপি আটক, শাম্মী আহত : সকাল সাড়ে দশটার দিকে নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে আসেন বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, রাশেদা বেগম হিরা, রেহেনা আকতার রানু ও শাম্মী আকতার। কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে গেলে পুলিশ গতিরোধ করে। বাধার মুখে এমপিরা গেটের সামনের রাস্তায় বসে পড়েন এবং হরতালের পক্ষে স্লোগান দেন। পরে ডিবিসহ মহিলা পুলিশ তাদের টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। শুয়ে পড়লে পাকা রাস্তায় টানতে টানতে ডিবি পুলিশের মাইক্রোতে তোলা হয়। গেট খোলা রেখেই গাড়িটি দ্রুত গতিতে চালানো শুরু করে। বেপরোয়া গতির মাইক্রো থেকে এমপি শাম্মী আকতার ও এক পুলিশ সদস্য ছিটকে রাস্তায় পড়েন। এতে শাম্মীর মাথায় আঘাত লাগে। পুলিশ তড়িঘড়ি করে এমপিদের ফের টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। দিনভর তাদের সেখানেই রাখা হয়। সন্ধ্যায় তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এদিকে মহিলা এমপিদের হত্যার উদ্দেশে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, অত্যন্ত বর্বরভাবে সরকারের লাঠিয়াল পুলিশ বাহিনী মহিলা এমপিদের রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে। রাস্তায় বসা এমপিরা শুয়ে পড়লে টানতে টানতে তাদের গাড়িতে তোলা হয়। তাতে চার এমপি-ই আহত হন। মাইক্রোবাসে তোলার পর উদ্দেশ্যমূলকভাবে জোর করে শাম্মী আকতারকে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়। রাজপথে লড়াকু এই এমপিকে হত্যার উদ্দেশে ফেলে দেয়া হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ সরকার ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে। আর পুলিশ-র্যাব ফ্যাসিবাদের নির্যাতক বহিনীর ভূমিকা পালন করছে, মানুষ হত্যা করছে। জনগণের জীবনরক্ষায় গ্রাম-মহল্লায় প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। সব আন্দোলনকে এক সুতোয় গেঁথে ফ্যাসিবাদ পতনের একদফার আন্দোলন শুরু হচ্ছে বলে তিনি জানান।
মিছিলে গুলি করতে দেরি হওয়ায় দুই পুলিশ প্রত্যাহার, আগ্রাসী পুলিশ কর্মকর্তার কাণ্ড : দুপুর ১টা ২০ মিনিট। নয়াপল্টনে ভাসানী ভবনের গলিতে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল শুরু হয়। মূল সড়কের দিকে এগোলে মিছিলকে লক্ষ্য করে পুলিশ তিন-চার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গলির ভেতরেই দৌড়ে পালায় মিছিলকারীরা।
পুলিশের কিছু সদস্য মিছিলে গুলি চালাতে দেরি করায় ক্ষিপ্ত হন নয়াপল্টনে দায়িত্বরত পুলিশের এডিসি (মতিঝিল জোন) মেহেদী হাসান। অন্য পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের তিনি তিরস্কার করেন। দায়িত্বরত অন্য কর্মকর্তাদের ধমক দিয়ে তিনি জানতে চান, ‘কে কোন ব্যাচে এবং কখন চাকরিতে এসেছে। গুলি করতে কেন দেরি করল।’ পরে ফোনে ঊর্ধ্বতন কর্তাদের কাছে তিনি পরিস্থিতি জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার পছন্দের পুলিশ সদস্যদের নয়াপল্টনে দায়িত্ব দিতে বলেন মেহেদী হাসান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সংবাদ কর্মীরা এ দৃশ্য দেখে আড়ালে সমালোচনা করেন। সবার সামনে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অপেশাদার আচরণে সাংবাদিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঘটনার আধা ঘণ্টার মধ্যে দু’জন পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
নগরজুড়ে ককটেল বিস্ফোরণ : গতকালের হরতালে রাজধানীজুড়ে চলে ককটেল ও সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণের মহড়া। দিনভর থেমে থেমে ছিল বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের দুই পাশে ১৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া যাত্রাবাড়ীতে ৮টি, বাসাবোতে ৬টি, বাড্ডায় ৫টি, মহাখালী ও গুলশানে ১৩টি, মিরপুরে কমপক্ষে ১৭টি, ধানমন্ডিতে ৬টি, রূপসীবাংলার সামনে ৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে।
বাসাবোতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা : হরতাল সমর্থকদের মিছিলের ছবি তোলায় বাসাবোতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। বেলা সাড়ে ১১টায় স্থানীয় বিএনপি হরতালের সমর্থনে বৌদ্ধমন্দির এলাকায় মিছিল বের করে। ফটো ও ক্যামেরা সাংবাদিকরা এ মিছিলের ছবি ধারণ করেন। মিছিল শেষ হতেই ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে হাজির হয় এবং ‘সাংবাদিকরাই হরতাল করাচ্ছে’ বলে অভিযোগ আনে। পুলিশের সামনেই তারা টিভি ক্যামেরা কেড়ে নেয় ও হামলা চালায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত টেলিভিশন সাংবাদিকরা জানান, বাসাবোর বৌদ্ধমন্দিরের কাছে হরতালের সমর্থনে স্থানীয় বিএনপির একটি মিছিলের ছবি আমরা সংগ্রহ করি। এসময় মিছিলের ছবি নেয়ার কারণে স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ড (সাবেক ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে। তারা কয়েকজন সাংবাদিকের পরিচয়পত্র, এটিএন নিউজ ও মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের ক্যামেরার মেমোরি কার্ড ছিনিয়ে নেয়।
হামলায় বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজের ক্যামেরাপার্সন গিয়াস উদ্দিন মামুন, চ্যানেল ২৪-এর ইমরান, একুশে টেলিভিশনের মইনুল ইসলাম, অনলাইন পত্রিকা জি নিউজের দু’জন রিপোর্টার আহত হন। পরে সাংবাদিকরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আশ্রয় নেয়। হামলার শিকার সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, পুলিশের সামনে হামলার পর নির্যাতকদের চিহ্নিত করিয়ে দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে ছাত্রলীগ কর্মীরা মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের ম্যামোরি কার্ড ফিরিয়ে দিলেও জি নিউজের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র ফেরত দেয়নি।
বিজয়ের আগ পর্যন্ত লড়াই চলবে—রিজভি : হরতাল শেষে নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এতে হরতাল চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, হরতালে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে। হরতালে রাজধানীসহ সারা দেশে ২৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ও ৬০০ জন আহত হয়েছে। হাজার ৫০০ নেতাকর্মীর ওপর মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। তিনি অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
যাত্রাবাড়ী : র্যাব, পুলিশ ও সরকারদলীয় লোকদের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন জায়গায় হরতালের সমর্থনে পিকেটিং এবং মিছিল করেছে বিএনপি-জামায়াত। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে শনিরআখড়া ব্রিজের কাছে মিছিল বের করে ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। এসময় তারা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে রাখে। বিস্ফোরণ ঘটায় কয়েকটি ককটেল। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও র্যাব এসে ফাঁকা গুলি ছুড়লে হরতাল সমর্থকরা সরে পড়ে। তাদের উদ্যোগে বিবিরবাগিচা, শনিরআখড়া, সাদ্দাম মার্কেট ও ধোলাইপাড় এলাকায় মিছিল, সমাবেশ ও পিকেটিং করে যাত্রাবাড়ী থানা জামায়াত-শিবির। বিবিরবাগিচায় একটি টেম্পোতে ও ধোলাইপাড়ে রাস্তায় আগুন দেয় পিকেটাররা। এসময় তারা সাঈদীর মুক্তি দাবি করে। সেখানে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ হয়। এদিকে সকালের পর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সারা দিনে তেমন কোনো পিকেটিং চোখে পড়েনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা ও পিকেটারমুক্ত থাকায় ওই এলাকায় বেশ কিছুসংখ্যক লোকাল বাস চলাচল করতে দেখা যায়। তবে সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। দুপুরের দিকে আওয়ামী যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ওই এলাকায় হরতালবিরোধী মিছিল ও সমাবেশ করে। এদিকে বেলা ১১টায় মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের পেছনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। বাসটি সাধারণ বীমা করপোরেশনের স্টাফ বাস। পরে স্থানীয় লোকজন আগুন নিভিয়ে ফেলে।
কারওয়ানবাজার : সকাল সোয়া ৬টায় কারওয়ানবাজার ওয়াসা ভবনের সামনে কে বা কারা দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আশপাশের ভবনে ও দোকানে তল্লাশি চালায়। তেজগাঁও ফার্মগেট এলাকায় হরতালে অফিস, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। প্রতিটি মোড়ে এমনকি অলিগলিতে র্যাব ও পুলিশকে সতর্ক থাকতে দেখা যায়। ফার্মগেট এলাকায় রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম ছিল।
মহাখালী-বনানী : গতকাল সকাল ৯টার পর মহাখালী-গুলশান রোডের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে হরতাল সমর্থনে লাঠিসোটা নিয়ে ঝটিকা মিছিল বের করে ছাত্রদল। এ সময় তারা কয়েকটি গাড়িতে লাঠি ও ইটের টুকরো দিয়ে আঘাত করে। ইটের আঘাতে আশপাশের দোকান-শোরুমের গ্লাস ভেঙে যায়। পুলিশ ধাওয়া দিলে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা অন্তত ৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। গতকাল বনানীতে ২টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। বেলা ৩টায় যুবলীগের অফিসের সামনে ককটেল দুটি বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজনকে আশপাশে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। পুলিশ এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি।
সংসদ ভবন এলাকা : হরতাল সমর্থনে সংসদ ভবন এলাকা মানিক মিয়া এভিনিউয়ে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলকারী বোতলজাত পানি বহনকারী গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়। এতে গাড়ির চালকের কক্ষ পুড়ে যায়। পরে গাড়ির চালক ও সহকারীর গাড়িতে থাকা পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। পরে পুলিশ এসে মিছিলকারীদের ব্যানার উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ জহিরুল নামের এক পথচারীকে আটক করে। সে রাজধানীর একটি বাড়ির নিরাপত্তা কর্মী।
মিরপুর : মিরপুর এলাকায় হরতাল সমর্থকদের তত্পরতা তেমন দেখা যায়নি। তবে হরতালবিরোধীরা কয়েক দফায় মিছিল করেছে। গতকাল সকাল ৭টায় মিরপুর-১ নম্বরে হরতাল সমর্থনে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলকারীরা দুটি গাড়ি ভাংচুর করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এমপি কামাল আহমেদ মজুমদারের নেতৃত্বে হরতালবিরোধী মিছিল বের হয়।
উত্তরা : উত্তরা ১১ নম্বর সংলগ্ন হাউজবিল্ডিং এলাকায় গতকাল সকালে থেমে থাকা দূরপাল্লার বাসে আগুন দিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। এতে বাসের সব ছিট পুড়ে গেছে। এর আগে সেখানে হরতাল সমর্থনে একটি মিছিল বের করা হয়।
খিলগাঁও : সকাল সাড়ে ৮টায় খিলগাঁওয়ে মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানার নেতৃত্বে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিল থেকে দুটি গাড়ি ভাংচুর করা হয়।
মোহাম্মদপুর : মোহাম্মদপুর লালমাটিয়া কলেজ এলাকায় গতকাল হরতালের সমর্থনে সকাল ৭টায় একটি মিছিল বের করে যুবদলের নেতাকর্মীরা। এসময় সেখানে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী পিকেটারদের ওপর হামলা করলে উভয়ের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ ঘটনায় দু’জন আহত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে যুবদলের কর্মীরা ওই এলাকা থেকে চলে যায়। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পরে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা একটি লাঠিমিছিল বের করলে ওই এলাকায় সাধারণ পথচারীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
নিউমার্কেট : নিউমার্কেট থানার পাশে ভোর পৌনে ৬টায় কে বা কারা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে কাউকে আটক করতে পারেনি।
কোতোয়ালি : ছাত্রলীগের ক্যাডারদের লাঠি ও দেশীয় অস্ত্রহাতে এই এলাকায় মহড়া দিতে দেখা গেছে। এতে সাধারণ পথচারীদের ও ছাত্রদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও লালবাগ, বংশাল, চকবাজারে ছাত্রদল ও যুবদল বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছে বলে জানা গেছে। তবে সেখানে পুলিশের সঙ্গে কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি।
জামায়াতের পিকেটিং ও মিছিল : হরতালের সমর্থনে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় পিকেটিং ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর জামায়াত। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সকালে মগবাজার, শান্তিনগর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল ও পিকেটিং করে জামায়াত-শিবির। এসব জায়গায় পুলিশ মিছিলকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ও ধাওয়া করে। এ সময় কয়েকজন আটক হয়। শান্তিনগর এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল-পরবর্তী সংক্ষিপ্ত এক সমাবেশে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও ঢাকা মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি ড. মু. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সরকার গণআন্দোলনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এখন জনগণের ওপর দলন-পীড়ন চালাচ্ছে। তারা বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দেশ থেকে ইসলাম ও ইসলামি মূল্যবোধ ধ্বংস করার জন্যই বিশ্ববরেণ্য মোফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ও যোগসাজশিভাবে ফাঁসির আদেশ দিয়ে দেশপ্রেমিক জনতা ও ইসলামপ্রিয় মানুষের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাই আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে ফরমায়েশি দণ্ডাদেশ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত জনগণের ক্ষোভ কখনোই প্রশমিত হবে না। জনগণের ক্ষোভ গণবিস্ফোরণে রূপ নিলে সরকার পালানোরও পথ পাবে না।
স্বেচ্ছাসেবক : হরতালের সমর্থনে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও পিকেটিং করেছে। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দলের সহ-দফতর সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে মালিবাগ ও শান্তিবাগে দুপুর ১২টায় হরতালের সমর্থনে মিছিল এবং রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে স্বেচ্ছাসেবক দল। দুপুরে খিলগাঁও ফ্লাইওভার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক রফিক হাওলাদার ও কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর নেতৃত্বে মিছিল বের করে স্বেচ্ছাসেবক দল। মিছিলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশ হামলা চালায়। এখানে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় ও ককটেল বিস্ফোরিত হয়।
ছাত্রদল : হরতালের সমর্থনে কোতোয়ালি, সবুজবাগ, মিরপুর বাঙলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতাকর্মীরা মিছিল করেছে। গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, পিকেটিং করার সময় সারাদেশে অর্ধশত ছাত্রদল নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এনডিপির মিছিলে ছাত্রলীগের হামলা : এনডিপি নেতারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টায় গাবতলী আমিন বাজারে এনডিপি ঢাকা জেলার নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে পিকেটিং করতে গেলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ তাতে হামলা চালায়। এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার নেতৃত্বে এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পার্টির ঢাকা মহানগর প্রেসিডেন্ট জামিল আহম্মেদ, ঢাকা জেলার নেতা হাজী বেলাল, ঢাকা মহানগর সদস্য-সচিব ফরিদ উদ্দিন, মো. মূসাসহ প্রমুখ।
বিভিন্ন সংগঠনের অভিনন্দন : এদিকে গতকাল ১৮ দলীয় জোটের হরতাল হলেও এর সমর্থনে বিএনপি জামায়াতের বাইরে শরিক অন্য কোনো দলের তেমন কোনো তত্পরতা দেখা যায়নি। কিছু দল মিছিল বা পিকেটিং করার চেষ্টা করলেও পুলিশি তত্পরতার কারণে তা সফল করতে পারেনি বলে তারা জানিয়েছে। তবে সারাদেশে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল সফল করায় দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। তারা হলেন জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী ও মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি ও মহাসচিব গোলামা মোস্তফা ভুইয়া, মুসলিম লীগের মহাসচিব আবুল খায়ের, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, ইসলামী ছাত্রসমাজের সভাপতি ইলিয়াছ আতহারী প্রমুখ।
চট্টগ্রামে শতাধিক গাড়ি ভাংচুর, র্যাবের গুলিতে গুলিবিদ্ধ ৫ : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ শতাধিক গাড়ি ভাংচুর করেছে হরতালকারীরা। তারা মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ও লোহার পাইপ ফেলে অবরোধ করে উপজেলার অন্তত ২০-২৫টি স্পটে। এ সময় বাড়বকুণ্ড এলাকায় পিকেটারদের ওপর র্যাব ২০-২৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। এতে যুবদলের ৩ নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ ও ৫ জন আহত হয়েছে।
এছাড়া হরতাল শুরুর পর নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজারসহ নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। নগরীর মোমিন রোড, বাকলিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় জামায়াতের নেতাকর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করে।
হরতালের সমর্থনে নগরীর নাসিমন ভবনে দলীয় কার্যালয়ের আশপাশে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত্ হোসেনের নেতৃত্বে মিছিল করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এছাড়া নগরীর ওয়াসা মোড়, কাজীর দেউড়ির মোড়, নূর আহমদ সড়কে মিছিল করেছেন মহিলা দলের নেতাকর্মীরা।
হরতাল চলাকালে নগরীর কাজীর দেউড়ি মোড়ে বিএনপির সমাবেশে বক্তারা বলেন, বিরোধী দলের নেতাদের হত্যার মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে রাজতন্ত্র কায়েমের স্বপ্ন দেখছেন প্রধানমন্ত্রী। মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ শামসুল আলমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, বেগম রোজী কবির, মাহবুবুর রহমান শামীম, কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি আবুল হাসেম বক্কর, মোশাররফ হোসেন দিপ্তী প্রমুখ।
এছাড়া জাফরুল ইসলাম চৌধুরী এমপির নেতৃত্বে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশমুখ কর্ণফুলী সেতু এলাকায়, অ্যাডভোকেট আলহাজ সেকান্দর বাদশার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আদালত ভবন এলাকায়, আগ্রাবাদ এলাকায় জাগপা নেতা আবু মোজাফ্ফর মোহাম্মদ আনাছ ও বায়েজিদ এলাকায় মো. আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টি এবং বহদ্দারহাট এলাকায় ন্যাপের সভাপতি ওসমান গনি শিকদারের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল হয়।
হরতালের সমর্থনে রাহাত্তারপুলের কর্মাশিয়াল কলেজের সামনে ছাত্রদল মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে ৬ ছাত্রদল নেতা আহত হন।
সিলেটে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত : সিলেটে কোনো ধরনের গোলযোগ ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবেই পালিত হয় বিএনপি-জামায়াতসহ ১৮ দলের ডাকা হরতাল। ভোরে একাধিক স্থানে জামায়াত-শিবির সংক্ষিপ্ত পিকেটিং ও টায়ার পুড়িয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সকাল পৌনে ৮টায় নগরীরর জিন্দাবাজার এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল করেছে স্বেচ্ছাসেবক দল। সকাল সাড়ে ৬টায় নগরীর দর্শনদেউড়ি এলাকায় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে হরতালকারীরা। মহানগর বিএনপি সভাপতি এমএ হক, যুবদলের কামরুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে আলাদা মিছিল বের করা হয় হরতালের সমর্থনে। হরতালের সমর্থনে জামায়াত-শিবিরও খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করেছে।
হরতালের কারণে রাস্তাঘাট ছিল অনেকটা ফাঁকা। দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। সরকারি অফিস-আদালত খোলা থাকলেও লোকজনের উপস্থিতি কম ছিল। সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের উদ্দেশে যথারীতি ট্রেন ছেড়ে গেলেও দূরপাল্লার কোনো বাস চলেনি।
ছাত্রদল ও ইলিয়াস মুক্তি ছাত্র সংগ্রাম : হরতালে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদল এবং ইলিয়াস মুক্তি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। বিক্ষোভ মিছিলটি সকালে সংগঠনের অস্থায়ী কার্যালয় মিরাবাজার থেকে শুরু হয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শিবগঞ্জ পয়েন্টে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।
জাগপা : হরতালের সমর্থনে রংমহল পয়েন্টে প্রতিবাদ সভা করে জাগপা। এতে বক্তৃতা করেন জেলা সভাপতি মকসুদ হোসেন। তিনি ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা খন্দকার লুত্ফুর রহমানকে গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন
বরিশালে আটক ২৫ : বরিশালে হরতাল চলাকালে বিভিন্ন স্থান থেকে ২৫ বিএনপি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সকালে দক্ষিণ জেলা বিএনপি একটি মিছিল বের করলে পুলিশ এতে হামলা চালায়। লাঠিচার্জে আহত হন ১৫ নেতাকর্মী। মিছিল থেকে গ্রেফতার করা হয় ছাত্রদল নেতা অ্যাডভোকেট তারেক আল ইমরান, জেলা জাসাস সাধারণ সম্পাদক মীর আদনান উদ্দিন তুহিন, সুজন ও রাব্বিসহ ৮ জনকে।
হরতালের সমর্থনে জেলা প্রশাসকের চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। এছাড়া মুলাদিতে হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশ ৭ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে।
ভোলা জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর জানিয়েছেন, স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালনকালে জেলা ইমাম সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা বনি আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ : রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ১৮ দলের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে বিএনপির মিছিলে হামলা চালায় পুলিশ। পুলিশ নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলনসহ অন্তত ৪৫ নেতাকর্মী আহত হন। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ৬ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। পরে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ৩ জনকে আটক পুলিশ।
এদিকে সকালে পবার হরিয়ান বাইপাস সড়কে ছাত্রশিবির একটি মালবাহী ট্রাক ভাংচুর করে। এ সময় তারা ট্রাকের চালককেও মারপিট করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে সকাল ৮টার দিকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা রাজশাহী বিমানবন্দর সড়কে গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ এবং কাদিরগঞ্জ এলাকায় রাস্তার ওপর টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করে। নগরীর বায়াবাজারে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
রংপুরে গ্রেফতার ৮ : রংপুরে সকাল সাতটার দিকে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় গড়ের মাথা এলাকায় পিকেটাররা দুটি নৈশ্যকোচে ভাংচুর করে। এছাড়া দুপুর পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে নগরীর হাজিরহাট এলাকায় দুপুরে পিকেটিং করার সময় ৮ শিবিরকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। দুপুরে নগরীর গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ের দলীয় কার্যালয় থেকে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোজাফফর হোসেনের নেতৃত্বে মিছিল বের হলে নগরীর জাহজ কোম্পানি মোড়ে পুলিশ বাধা দেয়।
বগুড়ায় ১৪৪ ধারা ভেঙে বিএনপি ও জামায়াতের মিছিল : সকাল-সন্ধ্যা হরতালে বগুড়ায় ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করেছে বিএনপি ও জামায়াত। দুপুর ১২টায় ১৪৪ ধারা ভেঙে বগুড়া শহরের শেরপুর রোড, সূত্রাপুর, জলেশ্বরীতলা ও মালতীনগরে বিএনপি মিছিল করেছে। জামায়াত শহরতলীর নিশ্চিন্তপুর ও চারমাথায় এবং শিবির শহরের খান্দার এলাকায় ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করেছে। বিকালে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শিবগঞ্জ ও শাজাহানপুরে ১৪৪ ধারা ভেঙে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি-জামায়াত।
পাবনায় পুলিশের গুলি, ভাংচুর মহাসড়ক অবরোধ : পাবনায় সকাল সাড়ে ১১টায় পাবনা-নগড়বাড়ী-ঢাকা মহাসড়কের জহিরপুর ও পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এলাকায় পুলিশ, র্যাব ও ডিবি পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালালে পিকেটার এবং গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ করে। এ সময় পুলিশ গুলি ছুড়লে ২ জন গুলিবিদ্ধ হয়। এরা হলেন—জহিরপুর গ্রামের মৃত নিজাম উদ্দিনের ছেলে মোকাররম হোসেন মোকাই এবং একই গ্রামের মৃত হোসেন প্রামাণিকের ছেলে রাজেম উদ্দিন।
এদিকে ঈশ্বরদীতে ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া (আইকে রোড) মহাসড়ক, ইপিজেডের সামনে ও দাশুড়িয়ায় বেশ কয়েকটি পণ্য ও ফলবাহী ট্রাক, ৮-৯টি মোটরসাইকেল, ব্যাটারি ও সিএনজি চালিত অটোরিকশাসহ প্রায় ২০-২৫টি যানবাহন ভাংচুর করেছে পিকেটাররা।
হরতাল সর্মথনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পাবনা জেলা বিএনপি ও ইসলামী ছাত্রশিবির পাবনা শহর শাখা। হরতালকালে সাঁথিয়ায় উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক আকমল হোসেনকে সাঁথিয়া বাজার থেকে দুপুরে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
রূপগঞ্জে আগুন, ভাংচুর, আহত ১২ : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদল ঢাকা বাইপাস সড়কের টেংরারটেক এলাকায় হরতাল সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ১২ নেতাকর্মীকে আহত করে। পরে পুলিশ ৩ জনকে আটক করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৪ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
এদিকে রূপগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সভাপতি আনোয়ার সাদাত সায়েম ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কর্নগোপ এলাকায় হরতাল সমর্থনে মিছিল বের করে। বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা ৬-৭টি যানবাহন ভাংচুর করে।
সাভারে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত : সভারে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। তরে দু’চারটা লোকাল বাস ও হালকা যানবাহন চলাচল করেছে।
হরতালের সমর্থনে পৌর মেয়র রেফাত উল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে, থানা সভাপতি হাজী মাহমুদুল হাসান আলালের নেতৃত্বে সিঅ্যান্ডবি এলাকায় এবং ঢাকা জেলা যুবদল নেতা আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকায় মিছিল করেছে বিএনপি।
সিরাজগঞ্জে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে আহত ২২ : সিরাজগঞ্জে ১৮ দলের হরতালে সকালে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ভাংচুর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। এতে আহত হয়েছে ২ পুলিশসহ কমপক্ষে ২২ জন। আহতদের মধ্যে ১৩ জনকে সদর হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, সকালে শহরের ৩টি স্থানে বিএনপির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ৬০ রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।
উল্লাপাড়ায় হরতাল সমর্থকদের আ.লীগের সংঘর্ষ : উল্লাপাড়ায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ হয়েছে। সকালে জামায়াত-বিএনপি কর্মীরা শহরের থানার মোড়ে মিছিল বের করলে সংঘর্ষ বাধে। একপযার্য়ে হরতাল সমর্থকরা আওয়ামী লীগ কর্মীদের হটিয়ে পুরো শহরের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। পুলিশ ও বিজিবি বিক্ষোভকারীদের ওপর রাবার বুলেট ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
না.গঞ্জে মাহমুদুর রহমানের ছবি ছিঁড়ে গালাগাল : নারায়ণগঞ্জে সকালে শহরের স্ট্যান্টার্ড চার্টার্ড (গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক মোড় হিসেবে পরিচিত) ব্যাংকের মোড়ে হরতালকারীদের মিছিলে হামলা চালিয়ে যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রানা মুজিবকে আটকের পর চোখ বেঁধে বেধড়ক লাঠিপেটা করেছে। এতে ওই নেতার ডান হাতের কব্জি ভেঙে যায়।
বুধবার রাতে শহরের মিশনপাড়া এলাকায় শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। এটিএম কামাল ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের দুটি ছবি ছিঁড়ে ফেলে এবং তাকে গালাগাল করে।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার জানান, বুধবার রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি টিম শহরের মাসদাইর তার বাড়িতে হানা দেয়। আমাকে না পেয়ে আমার বাড়িতে থাকা স্টাফদের মারধর করে।
গ্রেফতার ১৯ : হরতালের আগের রাতে নারায়ণগঞ্জের সদর, ফতুল্লা ও রূপগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদসহ ১৫ জন গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গাজীপুরে বিএনপির কার্যালয় ভাংচুর : গাজীপুরে গতকাল সন্ধ্যায় পুলিশের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা লাঠি মিছিল নিয়ে শহরের জেলা বিএনপির কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। এ সময় ছবি তুলতে গিয়ে হামলাকারীদের মারধরে ৩ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শহরে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা লাঠি মিছিল নিয়ে গাজীপুর শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলটি রাজবাড়ী সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা জেলা বিএনপির কার্যালয়ে হামলা চালায়। এ সময় ওই কার্যালয়ের সামনে পুলিশের একটি দল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিল। হামলাকারীরা ওই কার্যালয়ের চেয়ার টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাংচুর করে। পরে তারা সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে কার্যালয়ের বিভিন্ন মালামাল পুড়ে গেছে। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা আগুন নেভায়। এ সময় বিএনপি কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ছবি তুলতে গেলে হামলাকারীরা ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের স্থানীয় প্রতিনিধি হাসান, একাত্তর চ্যানেলের প্রতিনিধি ইকবাল আহমেদ সরকার ও দৈনিক দিনকালের প্রতিনিধি দেলোয়ার হোসেনকে মারপিট করে। এতে ওই ৩ সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়। এ ঘটনার পরপরই বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে হামলাকারীরা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের দিকে চলে যায়। পরে বিএনপি ও ছাত্রদলের কর্মীরা কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকে। এতে শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং লোক জন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। এ ঘটনার জন্য বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে দায়ী করেন এবং ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
খুলনা মহানগরে শান্তিপূর্ণ, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ : খুলনায় বিএনপি ও জামায়াতসহ ১৮ দলের আহ্বানে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ, আর্মড পুলিশ ও র্যাবের কড়া টহলদারী এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের হরতালবিরোধী মিছিল ও মহড়া দিনভর প্রত্যক্ষ করেছেন নগরবাসী। সকাল ৭টার দিকে দৌলতপুর মহসিন মোড়ে পিকেটাররা একটি প্রাইভেট কার ভাংচুর করে। সাড়ে ৭টায় খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে বিএনপি-জামায়াত বিক্ষোভ মিছিল বের করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর শেখপাড়া এলাকায় দুটি ইজিবাইক এবং গোয়ালখালী এলাকায় ৩টি ইজিবাইক ভাংচুর করা হয়। পুলিশ বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার সকালে ৬ জন হরতাল সমর্থক পিকেটারকে আটক করে। তারা হলেন, ছাত্রদল নেতা অয়ন, বাপ্পী, শহিদুল এবং খানজাহান আলী থানা যুবদল নেতা মাহফুজ মোড়ল, বিএনপি নেতা ওলিয়ার রহমান ও ছাত্রদল নেতা পলাশ। বিএনপির হরতালে সকাল ৯টার দিকে মহানগর যুবদল বড় বাজার এলাকায় মিছিল করেছে।
অন্যান্য হরতালের ন্যায় গতকালও মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি কে ডি ঘোষ রোডে দলীয় কার্যালয়ে এসে পৌঁছলে পুলিশ রাস্তার দু’পাশে কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে জনগণের চলাচল বন্ধ করে দেয়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এরপর কড়াকড়ি শিথিল হলে হরতালের সমর্থনে একটি সমাবেশ করেছে বিএনপি। নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপির সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন এম নূরুল ইসলাম দাদু ভাই। বক্তব্য রাখেন, মনিরুজ্জামান মনি, সৈয়দা নার্গিস আলী, অধ্যাপক আমীর আলী, রেহেনা ঈসা, ফখরুল আলম, অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান মন্টু, আবু হোসেন বাবু, শফিকুল আলম তুহিন, শের আলম সান্টু, আজিজুল হাসান দুলু প্রমুখ। এদিকে হরতাল চলাকালে নগরীর রূপসা স্ট্যান্ড রোডে এক বিক্ষোভ মিছিল বের করে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামী। মিছিলে নেতৃত্ব দেন খুলনা সদর থানা সেক্রেটারি মো. অলিউল্লাহ, অধ্যক্ষ মুস্তাফিজুর রহমান টিংকু, আকরামুজ্জামান রাজা, এমরান হোসাইন প্রমুখ।
পাইকগাছায় বাস ভাংচুর, সড়ক অবরোধ ও মহিলাদের ঝাড়ুমিছিল : খুলনার পাইকগাছায় বাস ভাংচুর, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, সড়ক অবরোধ ও মহিলাদের ঝাড়ুমিছিলের মধ্য দিয়ে ১৮ দলের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালে পিকেটাররা একটি পরিবহন বাস, একটি মোটরসাইকের ভাংচুর ও গাছের গুঁড়ি অপসারণকালে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। হরতাল চলাকালে সকালে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা পৌর সদরে বিক্ষোভ মিছিল করে। অপরদিকে নারী ও শিশুরা সাঈদীর মুক্তি দাবিতে ঝাড়ু মিছিল করেছে। পরে জামায়াত ও বিএনপি সমর্থিত পিকেটাররা সরল বাজারসহ প্রধান সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি, বড় বড় ডালপালা, ইট, টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে ও বাস দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে সড়ক অবরোধ করে রাখে। বেলা ১১টার দিকে সরল বাজারে পিকেটাররা খুলনা-হ-১০-০৫৭৭ নং জংশন ইডি ৮০ মোটরসাইকেলটি ভাংচুর করে। এদিকে আগের দিন রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা হানিফ পরিবহন ভোরে উপজেলার কাশিমনগর এলাকায় অবস্থান নিলে কয়েক দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালিয়ে বাসের পাশের ১১টি গ্লাস সম্পূর্ণ ভাংচুর করে। পাইকগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) শেখ আবু বকর সিদ্দিক সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে রাস্তা থেকে গাছের গুঁড়ি ও ডালপালা অপসারণ করে।
ডুমুরিয়ায় জামায়াত-শিবিরের মিছিল বের করার চেষ্টা, হামলায় চারজন আহত : সাঈদীসহ সব নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া বাজারের মিছিল বের চেষ্টা করলে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ জনতা ধাওয়া করে। এ সময় দুটি চায়ের দোকান ভাংচুর ও শিবিরের ৩-৪ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঢাকার বাইরেও সহিংস ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে বিভিন্ন জেলায় হরতাল সমর্থনে মিছিল হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে হরতাল সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষে আওয়ামী লীগের এক কর্মী নিহত হয়। লাকসামে রেললাইনের স্লিপারে আগুন ধরিয়ে দেয় পিকেটাররা। গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, পাবনা, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ, মাগুরা, সীতাকুণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির মিছিলে বেধড়ক লাঠিচার্জ ও গুলি চালিয়েছে র্যাব-পুলিশ। এতে অনেক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কুমিল্লা, নরসিংদী ও মিরসরাইসহ অনেক জেলার মহাসড়ক অবরোধ করে পিকেটাররা। হরতাল প্রতিরোধে সারাদেশেই তাণ্ডব চালায় পুলিশ ও সরকারি দলের ক্যাডাররা। তাদের হামলায় আহত হন বিএনপি-জামায়াতের তিন শতাধিক নেতাকর্মী। শুধু বিএনপিরই দু’শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তবে ডিএমপি দাবি করেছে, গতকাল হরতালে ২৮ পিকেটারকে আটক করা হয়েছে। হরতালে রাজধানীতে দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ ছিল বন্ধ। নগরীতে কিছু বাস বের হলেও এ সংখ্যা ছিল সামান্য। দূরপাল্লার কোনো গাড়ি চলাচল করেনি। আন্তঃজেলা বাস সার্ভিস বন্ধ থাকায় বিচ্ছিন্ন ছিল জেলাগুলো।
হরতাল সফলভাবে পালন করায় জোটের নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ১৮ দলীয় জোট নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী হরতাল শেষে নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারপার্সনের পক্ষে এ অভিনন্দন জানান। পৃথকভাবে দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
হরতাল শেষে নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা না হলেও গত রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। ওই সভায় পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে বলে জানান রুহুল কবির রিজভী। তবে তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লড়াইয়ে বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিহত ১ : গতকাল হরতালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার পোলাডাঙ্গায় বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে আবদুর রহমান (২৬) নামে এক যুবলীগ কর্মী নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। নিহত আবদুর রহমান উপজেলার পোলাডাঙ্গা হাটখোলা গ্রামের দাউদ হোসেনের ছেলে। ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হরতালের সমর্থনে সকাল সাড়ে দশটার দিকে বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা পোলাডাঙ্গা হাটখোলা বাজার এলাকায় মিছিল বের করে। এ সময় হরতালে দোকান খোলা রাখাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। লাঠিসোটা, ধারালো অস্ত্র ও ইট-পাটকেল নিয়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে ৭-৮টি দোকান ও ২টি মোটরসাইকেল ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আগুন নেভানোর জন্য পার্শ্ববর্তী গোমস্তাপুর উপজেলা থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় দুপুরে ভোলাহাটের মুসরীভুজা এলাকায় পৌঁছলে হরতাল সমর্থকরা তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সংঘর্ষে আহত স্থানীয় যুবলীগকর্মী আবদুর রহমানকে ভোলাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পথে মারা যায়। এছাড়া সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়। তাদের স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ভোলাহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদ সোহরাওয়ার্দী জানান, সংঘর্ষের পর ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভোলাহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন আক্তার জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অবরুদ্ধ বিএনপি কার্যালয় : হরতাল ঠেকাতে বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে পুলিশের আগ্রাসী ভূমিকা আরও একধাপ এগিয়ে গেছে। গতকাল কার্যালয়ের মূল গেটও বন্ধ করে দেয় তারা। দলটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের নেতৃত্বে ৩০ জনের মতো বিএনপিকর্মী গেটে অবস্থান নিয়ে হরতালের পক্ষে স্লোগান দেয়। কিন্তু সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ সদস্যরা কার্যালয়ের গেটঘেঁষে দাড়ান এবং গেট বন্ধ করে দেন। সারাদিনে কার্যালয়ে কোনো নেতাকর্মী প্রবেশ করতে পারেনি। প্রবেশের চেষ্টা করলে চার মহিলা এমপিকে পুলিশ আটক করে। এমনকি কোনো ধরনের খাদ্যদ্রব্যও গেট থেকে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের জন্য নয়াপল্টন এলাকার একটি বাসা থেকে আসা দুপুরের খাবারের টিফিনবক্সটিও পুলিশ আটকে দেয়। বুধবার বিকাল থেকে অবস্থান নেয়া নেতাকর্মীরা বন্ধ গেটের ভেতরেই হরতালের পক্ষে স্লোগান দেন। এতে আরও ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ জনি, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, বেলাল আহমেদ, শাহজাহান সম্রাট, মহানগর নেতা এম এ হান্নানসহ বিএনপি ও অঙ্গদলের ৩০ জনের মতো নেতাকর্মী।
চার মহিলা এমপি আটক, শাম্মী আহত : সকাল সাড়ে দশটার দিকে নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে আসেন বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, রাশেদা বেগম হিরা, রেহেনা আকতার রানু ও শাম্মী আকতার। কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে গেলে পুলিশ গতিরোধ করে। বাধার মুখে এমপিরা গেটের সামনের রাস্তায় বসে পড়েন এবং হরতালের পক্ষে স্লোগান দেন। পরে ডিবিসহ মহিলা পুলিশ তাদের টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। শুয়ে পড়লে পাকা রাস্তায় টানতে টানতে ডিবি পুলিশের মাইক্রোতে তোলা হয়। গেট খোলা রেখেই গাড়িটি দ্রুত গতিতে চালানো শুরু করে। বেপরোয়া গতির মাইক্রো থেকে এমপি শাম্মী আকতার ও এক পুলিশ সদস্য ছিটকে রাস্তায় পড়েন। এতে শাম্মীর মাথায় আঘাত লাগে। পুলিশ তড়িঘড়ি করে এমপিদের ফের টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। দিনভর তাদের সেখানেই রাখা হয়। সন্ধ্যায় তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এদিকে মহিলা এমপিদের হত্যার উদ্দেশে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, অত্যন্ত বর্বরভাবে সরকারের লাঠিয়াল পুলিশ বাহিনী মহিলা এমপিদের রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে। রাস্তায় বসা এমপিরা শুয়ে পড়লে টানতে টানতে তাদের গাড়িতে তোলা হয়। তাতে চার এমপি-ই আহত হন। মাইক্রোবাসে তোলার পর উদ্দেশ্যমূলকভাবে জোর করে শাম্মী আকতারকে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়। রাজপথে লড়াকু এই এমপিকে হত্যার উদ্দেশে ফেলে দেয়া হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ সরকার ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে। আর পুলিশ-র্যাব ফ্যাসিবাদের নির্যাতক বহিনীর ভূমিকা পালন করছে, মানুষ হত্যা করছে। জনগণের জীবনরক্ষায় গ্রাম-মহল্লায় প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। সব আন্দোলনকে এক সুতোয় গেঁথে ফ্যাসিবাদ পতনের একদফার আন্দোলন শুরু হচ্ছে বলে তিনি জানান।
মিছিলে গুলি করতে দেরি হওয়ায় দুই পুলিশ প্রত্যাহার, আগ্রাসী পুলিশ কর্মকর্তার কাণ্ড : দুপুর ১টা ২০ মিনিট। নয়াপল্টনে ভাসানী ভবনের গলিতে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল শুরু হয়। মূল সড়কের দিকে এগোলে মিছিলকে লক্ষ্য করে পুলিশ তিন-চার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গলির ভেতরেই দৌড়ে পালায় মিছিলকারীরা।
পুলিশের কিছু সদস্য মিছিলে গুলি চালাতে দেরি করায় ক্ষিপ্ত হন নয়াপল্টনে দায়িত্বরত পুলিশের এডিসি (মতিঝিল জোন) মেহেদী হাসান। অন্য পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের তিনি তিরস্কার করেন। দায়িত্বরত অন্য কর্মকর্তাদের ধমক দিয়ে তিনি জানতে চান, ‘কে কোন ব্যাচে এবং কখন চাকরিতে এসেছে। গুলি করতে কেন দেরি করল।’ পরে ফোনে ঊর্ধ্বতন কর্তাদের কাছে তিনি পরিস্থিতি জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার পছন্দের পুলিশ সদস্যদের নয়াপল্টনে দায়িত্ব দিতে বলেন মেহেদী হাসান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সংবাদ কর্মীরা এ দৃশ্য দেখে আড়ালে সমালোচনা করেন। সবার সামনে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অপেশাদার আচরণে সাংবাদিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঘটনার আধা ঘণ্টার মধ্যে দু’জন পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
নগরজুড়ে ককটেল বিস্ফোরণ : গতকালের হরতালে রাজধানীজুড়ে চলে ককটেল ও সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণের মহড়া। দিনভর থেমে থেমে ছিল বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের দুই পাশে ১৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া যাত্রাবাড়ীতে ৮টি, বাসাবোতে ৬টি, বাড্ডায় ৫টি, মহাখালী ও গুলশানে ১৩টি, মিরপুরে কমপক্ষে ১৭টি, ধানমন্ডিতে ৬টি, রূপসীবাংলার সামনে ৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে।
বাসাবোতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা : হরতাল সমর্থকদের মিছিলের ছবি তোলায় বাসাবোতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। বেলা সাড়ে ১১টায় স্থানীয় বিএনপি হরতালের সমর্থনে বৌদ্ধমন্দির এলাকায় মিছিল বের করে। ফটো ও ক্যামেরা সাংবাদিকরা এ মিছিলের ছবি ধারণ করেন। মিছিল শেষ হতেই ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে হাজির হয় এবং ‘সাংবাদিকরাই হরতাল করাচ্ছে’ বলে অভিযোগ আনে। পুলিশের সামনেই তারা টিভি ক্যামেরা কেড়ে নেয় ও হামলা চালায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত টেলিভিশন সাংবাদিকরা জানান, বাসাবোর বৌদ্ধমন্দিরের কাছে হরতালের সমর্থনে স্থানীয় বিএনপির একটি মিছিলের ছবি আমরা সংগ্রহ করি। এসময় মিছিলের ছবি নেয়ার কারণে স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ড (সাবেক ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে। তারা কয়েকজন সাংবাদিকের পরিচয়পত্র, এটিএন নিউজ ও মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের ক্যামেরার মেমোরি কার্ড ছিনিয়ে নেয়।
হামলায় বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজের ক্যামেরাপার্সন গিয়াস উদ্দিন মামুন, চ্যানেল ২৪-এর ইমরান, একুশে টেলিভিশনের মইনুল ইসলাম, অনলাইন পত্রিকা জি নিউজের দু’জন রিপোর্টার আহত হন। পরে সাংবাদিকরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আশ্রয় নেয়। হামলার শিকার সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, পুলিশের সামনে হামলার পর নির্যাতকদের চিহ্নিত করিয়ে দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে ছাত্রলীগ কর্মীরা মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের ম্যামোরি কার্ড ফিরিয়ে দিলেও জি নিউজের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র ফেরত দেয়নি।
বিজয়ের আগ পর্যন্ত লড়াই চলবে—রিজভি : হরতাল শেষে নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এতে হরতাল চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, হরতালে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে। হরতালে রাজধানীসহ সারা দেশে ২৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ও ৬০০ জন আহত হয়েছে। হাজার ৫০০ নেতাকর্মীর ওপর মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। তিনি অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
যাত্রাবাড়ী : র্যাব, পুলিশ ও সরকারদলীয় লোকদের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন জায়গায় হরতালের সমর্থনে পিকেটিং এবং মিছিল করেছে বিএনপি-জামায়াত। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে শনিরআখড়া ব্রিজের কাছে মিছিল বের করে ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। এসময় তারা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে রাখে। বিস্ফোরণ ঘটায় কয়েকটি ককটেল। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও র্যাব এসে ফাঁকা গুলি ছুড়লে হরতাল সমর্থকরা সরে পড়ে। তাদের উদ্যোগে বিবিরবাগিচা, শনিরআখড়া, সাদ্দাম মার্কেট ও ধোলাইপাড় এলাকায় মিছিল, সমাবেশ ও পিকেটিং করে যাত্রাবাড়ী থানা জামায়াত-শিবির। বিবিরবাগিচায় একটি টেম্পোতে ও ধোলাইপাড়ে রাস্তায় আগুন দেয় পিকেটাররা। এসময় তারা সাঈদীর মুক্তি দাবি করে। সেখানে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ হয়। এদিকে সকালের পর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সারা দিনে তেমন কোনো পিকেটিং চোখে পড়েনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা ও পিকেটারমুক্ত থাকায় ওই এলাকায় বেশ কিছুসংখ্যক লোকাল বাস চলাচল করতে দেখা যায়। তবে সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। দুপুরের দিকে আওয়ামী যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ওই এলাকায় হরতালবিরোধী মিছিল ও সমাবেশ করে। এদিকে বেলা ১১টায় মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের পেছনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। বাসটি সাধারণ বীমা করপোরেশনের স্টাফ বাস। পরে স্থানীয় লোকজন আগুন নিভিয়ে ফেলে।
কারওয়ানবাজার : সকাল সোয়া ৬টায় কারওয়ানবাজার ওয়াসা ভবনের সামনে কে বা কারা দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আশপাশের ভবনে ও দোকানে তল্লাশি চালায়। তেজগাঁও ফার্মগেট এলাকায় হরতালে অফিস, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। প্রতিটি মোড়ে এমনকি অলিগলিতে র্যাব ও পুলিশকে সতর্ক থাকতে দেখা যায়। ফার্মগেট এলাকায় রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম ছিল।
মহাখালী-বনানী : গতকাল সকাল ৯টার পর মহাখালী-গুলশান রোডের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে হরতাল সমর্থনে লাঠিসোটা নিয়ে ঝটিকা মিছিল বের করে ছাত্রদল। এ সময় তারা কয়েকটি গাড়িতে লাঠি ও ইটের টুকরো দিয়ে আঘাত করে। ইটের আঘাতে আশপাশের দোকান-শোরুমের গ্লাস ভেঙে যায়। পুলিশ ধাওয়া দিলে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা অন্তত ৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। গতকাল বনানীতে ২টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। বেলা ৩টায় যুবলীগের অফিসের সামনে ককটেল দুটি বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজনকে আশপাশে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। পুলিশ এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি।
সংসদ ভবন এলাকা : হরতাল সমর্থনে সংসদ ভবন এলাকা মানিক মিয়া এভিনিউয়ে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলকারী বোতলজাত পানি বহনকারী গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়। এতে গাড়ির চালকের কক্ষ পুড়ে যায়। পরে গাড়ির চালক ও সহকারীর গাড়িতে থাকা পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। পরে পুলিশ এসে মিছিলকারীদের ব্যানার উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ জহিরুল নামের এক পথচারীকে আটক করে। সে রাজধানীর একটি বাড়ির নিরাপত্তা কর্মী।
মিরপুর : মিরপুর এলাকায় হরতাল সমর্থকদের তত্পরতা তেমন দেখা যায়নি। তবে হরতালবিরোধীরা কয়েক দফায় মিছিল করেছে। গতকাল সকাল ৭টায় মিরপুর-১ নম্বরে হরতাল সমর্থনে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলকারীরা দুটি গাড়ি ভাংচুর করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এমপি কামাল আহমেদ মজুমদারের নেতৃত্বে হরতালবিরোধী মিছিল বের হয়।
উত্তরা : উত্তরা ১১ নম্বর সংলগ্ন হাউজবিল্ডিং এলাকায় গতকাল সকালে থেমে থাকা দূরপাল্লার বাসে আগুন দিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। এতে বাসের সব ছিট পুড়ে গেছে। এর আগে সেখানে হরতাল সমর্থনে একটি মিছিল বের করা হয়।
খিলগাঁও : সকাল সাড়ে ৮টায় খিলগাঁওয়ে মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানার নেতৃত্বে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিল থেকে দুটি গাড়ি ভাংচুর করা হয়।
মোহাম্মদপুর : মোহাম্মদপুর লালমাটিয়া কলেজ এলাকায় গতকাল হরতালের সমর্থনে সকাল ৭টায় একটি মিছিল বের করে যুবদলের নেতাকর্মীরা। এসময় সেখানে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী পিকেটারদের ওপর হামলা করলে উভয়ের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ ঘটনায় দু’জন আহত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে যুবদলের কর্মীরা ওই এলাকা থেকে চলে যায়। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পরে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা একটি লাঠিমিছিল বের করলে ওই এলাকায় সাধারণ পথচারীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
নিউমার্কেট : নিউমার্কেট থানার পাশে ভোর পৌনে ৬টায় কে বা কারা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে কাউকে আটক করতে পারেনি।
কোতোয়ালি : ছাত্রলীগের ক্যাডারদের লাঠি ও দেশীয় অস্ত্রহাতে এই এলাকায় মহড়া দিতে দেখা গেছে। এতে সাধারণ পথচারীদের ও ছাত্রদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও লালবাগ, বংশাল, চকবাজারে ছাত্রদল ও যুবদল বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছে বলে জানা গেছে। তবে সেখানে পুলিশের সঙ্গে কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি।
জামায়াতের পিকেটিং ও মিছিল : হরতালের সমর্থনে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় পিকেটিং ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর জামায়াত। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সকালে মগবাজার, শান্তিনগর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল ও পিকেটিং করে জামায়াত-শিবির। এসব জায়গায় পুলিশ মিছিলকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ও ধাওয়া করে। এ সময় কয়েকজন আটক হয়। শান্তিনগর এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল-পরবর্তী সংক্ষিপ্ত এক সমাবেশে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও ঢাকা মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি ড. মু. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সরকার গণআন্দোলনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এখন জনগণের ওপর দলন-পীড়ন চালাচ্ছে। তারা বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দেশ থেকে ইসলাম ও ইসলামি মূল্যবোধ ধ্বংস করার জন্যই বিশ্ববরেণ্য মোফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ও যোগসাজশিভাবে ফাঁসির আদেশ দিয়ে দেশপ্রেমিক জনতা ও ইসলামপ্রিয় মানুষের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাই আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে ফরমায়েশি দণ্ডাদেশ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত জনগণের ক্ষোভ কখনোই প্রশমিত হবে না। জনগণের ক্ষোভ গণবিস্ফোরণে রূপ নিলে সরকার পালানোরও পথ পাবে না।
স্বেচ্ছাসেবক : হরতালের সমর্থনে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও পিকেটিং করেছে। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দলের সহ-দফতর সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে মালিবাগ ও শান্তিবাগে দুপুর ১২টায় হরতালের সমর্থনে মিছিল এবং রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে স্বেচ্ছাসেবক দল। দুপুরে খিলগাঁও ফ্লাইওভার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক রফিক হাওলাদার ও কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর নেতৃত্বে মিছিল বের করে স্বেচ্ছাসেবক দল। মিছিলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশ হামলা চালায়। এখানে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় ও ককটেল বিস্ফোরিত হয়।
ছাত্রদল : হরতালের সমর্থনে কোতোয়ালি, সবুজবাগ, মিরপুর বাঙলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতাকর্মীরা মিছিল করেছে। গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, পিকেটিং করার সময় সারাদেশে অর্ধশত ছাত্রদল নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এনডিপির মিছিলে ছাত্রলীগের হামলা : এনডিপি নেতারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টায় গাবতলী আমিন বাজারে এনডিপি ঢাকা জেলার নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে পিকেটিং করতে গেলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ তাতে হামলা চালায়। এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার নেতৃত্বে এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পার্টির ঢাকা মহানগর প্রেসিডেন্ট জামিল আহম্মেদ, ঢাকা জেলার নেতা হাজী বেলাল, ঢাকা মহানগর সদস্য-সচিব ফরিদ উদ্দিন, মো. মূসাসহ প্রমুখ।
বিভিন্ন সংগঠনের অভিনন্দন : এদিকে গতকাল ১৮ দলীয় জোটের হরতাল হলেও এর সমর্থনে বিএনপি জামায়াতের বাইরে শরিক অন্য কোনো দলের তেমন কোনো তত্পরতা দেখা যায়নি। কিছু দল মিছিল বা পিকেটিং করার চেষ্টা করলেও পুলিশি তত্পরতার কারণে তা সফল করতে পারেনি বলে তারা জানিয়েছে। তবে সারাদেশে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল সফল করায় দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। তারা হলেন জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী ও মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি ও মহাসচিব গোলামা মোস্তফা ভুইয়া, মুসলিম লীগের মহাসচিব আবুল খায়ের, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, ইসলামী ছাত্রসমাজের সভাপতি ইলিয়াছ আতহারী প্রমুখ।
চট্টগ্রামে শতাধিক গাড়ি ভাংচুর, র্যাবের গুলিতে গুলিবিদ্ধ ৫ : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ শতাধিক গাড়ি ভাংচুর করেছে হরতালকারীরা। তারা মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ও লোহার পাইপ ফেলে অবরোধ করে উপজেলার অন্তত ২০-২৫টি স্পটে। এ সময় বাড়বকুণ্ড এলাকায় পিকেটারদের ওপর র্যাব ২০-২৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। এতে যুবদলের ৩ নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ ও ৫ জন আহত হয়েছে।
এছাড়া হরতাল শুরুর পর নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজারসহ নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। নগরীর মোমিন রোড, বাকলিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় জামায়াতের নেতাকর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করে।
হরতালের সমর্থনে নগরীর নাসিমন ভবনে দলীয় কার্যালয়ের আশপাশে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত্ হোসেনের নেতৃত্বে মিছিল করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এছাড়া নগরীর ওয়াসা মোড়, কাজীর দেউড়ির মোড়, নূর আহমদ সড়কে মিছিল করেছেন মহিলা দলের নেতাকর্মীরা।
হরতাল চলাকালে নগরীর কাজীর দেউড়ি মোড়ে বিএনপির সমাবেশে বক্তারা বলেন, বিরোধী দলের নেতাদের হত্যার মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে রাজতন্ত্র কায়েমের স্বপ্ন দেখছেন প্রধানমন্ত্রী। মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ শামসুল আলমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, বেগম রোজী কবির, মাহবুবুর রহমান শামীম, কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি আবুল হাসেম বক্কর, মোশাররফ হোসেন দিপ্তী প্রমুখ।
এছাড়া জাফরুল ইসলাম চৌধুরী এমপির নেতৃত্বে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশমুখ কর্ণফুলী সেতু এলাকায়, অ্যাডভোকেট আলহাজ সেকান্দর বাদশার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আদালত ভবন এলাকায়, আগ্রাবাদ এলাকায় জাগপা নেতা আবু মোজাফ্ফর মোহাম্মদ আনাছ ও বায়েজিদ এলাকায় মো. আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টি এবং বহদ্দারহাট এলাকায় ন্যাপের সভাপতি ওসমান গনি শিকদারের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল হয়।
হরতালের সমর্থনে রাহাত্তারপুলের কর্মাশিয়াল কলেজের সামনে ছাত্রদল মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে ৬ ছাত্রদল নেতা আহত হন।
সিলেটে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত : সিলেটে কোনো ধরনের গোলযোগ ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবেই পালিত হয় বিএনপি-জামায়াতসহ ১৮ দলের ডাকা হরতাল। ভোরে একাধিক স্থানে জামায়াত-শিবির সংক্ষিপ্ত পিকেটিং ও টায়ার পুড়িয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সকাল পৌনে ৮টায় নগরীরর জিন্দাবাজার এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল করেছে স্বেচ্ছাসেবক দল। সকাল সাড়ে ৬টায় নগরীর দর্শনদেউড়ি এলাকায় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে হরতালকারীরা। মহানগর বিএনপি সভাপতি এমএ হক, যুবদলের কামরুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে আলাদা মিছিল বের করা হয় হরতালের সমর্থনে। হরতালের সমর্থনে জামায়াত-শিবিরও খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করেছে।
হরতালের কারণে রাস্তাঘাট ছিল অনেকটা ফাঁকা। দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। সরকারি অফিস-আদালত খোলা থাকলেও লোকজনের উপস্থিতি কম ছিল। সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের উদ্দেশে যথারীতি ট্রেন ছেড়ে গেলেও দূরপাল্লার কোনো বাস চলেনি।
ছাত্রদল ও ইলিয়াস মুক্তি ছাত্র সংগ্রাম : হরতালে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদল এবং ইলিয়াস মুক্তি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। বিক্ষোভ মিছিলটি সকালে সংগঠনের অস্থায়ী কার্যালয় মিরাবাজার থেকে শুরু হয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শিবগঞ্জ পয়েন্টে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।
জাগপা : হরতালের সমর্থনে রংমহল পয়েন্টে প্রতিবাদ সভা করে জাগপা। এতে বক্তৃতা করেন জেলা সভাপতি মকসুদ হোসেন। তিনি ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা খন্দকার লুত্ফুর রহমানকে গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন
বরিশালে আটক ২৫ : বরিশালে হরতাল চলাকালে বিভিন্ন স্থান থেকে ২৫ বিএনপি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সকালে দক্ষিণ জেলা বিএনপি একটি মিছিল বের করলে পুলিশ এতে হামলা চালায়। লাঠিচার্জে আহত হন ১৫ নেতাকর্মী। মিছিল থেকে গ্রেফতার করা হয় ছাত্রদল নেতা অ্যাডভোকেট তারেক আল ইমরান, জেলা জাসাস সাধারণ সম্পাদক মীর আদনান উদ্দিন তুহিন, সুজন ও রাব্বিসহ ৮ জনকে।
হরতালের সমর্থনে জেলা প্রশাসকের চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। এছাড়া মুলাদিতে হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশ ৭ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে।
ভোলা জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর জানিয়েছেন, স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালনকালে জেলা ইমাম সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা বনি আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ : রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ১৮ দলের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে বিএনপির মিছিলে হামলা চালায় পুলিশ। পুলিশ নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলনসহ অন্তত ৪৫ নেতাকর্মী আহত হন। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ৬ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। পরে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ৩ জনকে আটক পুলিশ।
এদিকে সকালে পবার হরিয়ান বাইপাস সড়কে ছাত্রশিবির একটি মালবাহী ট্রাক ভাংচুর করে। এ সময় তারা ট্রাকের চালককেও মারপিট করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে সকাল ৮টার দিকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা রাজশাহী বিমানবন্দর সড়কে গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ এবং কাদিরগঞ্জ এলাকায় রাস্তার ওপর টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করে। নগরীর বায়াবাজারে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
রংপুরে গ্রেফতার ৮ : রংপুরে সকাল সাতটার দিকে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় গড়ের মাথা এলাকায় পিকেটাররা দুটি নৈশ্যকোচে ভাংচুর করে। এছাড়া দুপুর পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে নগরীর হাজিরহাট এলাকায় দুপুরে পিকেটিং করার সময় ৮ শিবিরকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। দুপুরে নগরীর গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ের দলীয় কার্যালয় থেকে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোজাফফর হোসেনের নেতৃত্বে মিছিল বের হলে নগরীর জাহজ কোম্পানি মোড়ে পুলিশ বাধা দেয়।
বগুড়ায় ১৪৪ ধারা ভেঙে বিএনপি ও জামায়াতের মিছিল : সকাল-সন্ধ্যা হরতালে বগুড়ায় ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করেছে বিএনপি ও জামায়াত। দুপুর ১২টায় ১৪৪ ধারা ভেঙে বগুড়া শহরের শেরপুর রোড, সূত্রাপুর, জলেশ্বরীতলা ও মালতীনগরে বিএনপি মিছিল করেছে। জামায়াত শহরতলীর নিশ্চিন্তপুর ও চারমাথায় এবং শিবির শহরের খান্দার এলাকায় ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করেছে। বিকালে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শিবগঞ্জ ও শাজাহানপুরে ১৪৪ ধারা ভেঙে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি-জামায়াত।
পাবনায় পুলিশের গুলি, ভাংচুর মহাসড়ক অবরোধ : পাবনায় সকাল সাড়ে ১১টায় পাবনা-নগড়বাড়ী-ঢাকা মহাসড়কের জহিরপুর ও পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এলাকায় পুলিশ, র্যাব ও ডিবি পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালালে পিকেটার এবং গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ করে। এ সময় পুলিশ গুলি ছুড়লে ২ জন গুলিবিদ্ধ হয়। এরা হলেন—জহিরপুর গ্রামের মৃত নিজাম উদ্দিনের ছেলে মোকাররম হোসেন মোকাই এবং একই গ্রামের মৃত হোসেন প্রামাণিকের ছেলে রাজেম উদ্দিন।
এদিকে ঈশ্বরদীতে ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া (আইকে রোড) মহাসড়ক, ইপিজেডের সামনে ও দাশুড়িয়ায় বেশ কয়েকটি পণ্য ও ফলবাহী ট্রাক, ৮-৯টি মোটরসাইকেল, ব্যাটারি ও সিএনজি চালিত অটোরিকশাসহ প্রায় ২০-২৫টি যানবাহন ভাংচুর করেছে পিকেটাররা।
হরতাল সর্মথনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পাবনা জেলা বিএনপি ও ইসলামী ছাত্রশিবির পাবনা শহর শাখা। হরতালকালে সাঁথিয়ায় উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক আকমল হোসেনকে সাঁথিয়া বাজার থেকে দুপুরে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
রূপগঞ্জে আগুন, ভাংচুর, আহত ১২ : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদল ঢাকা বাইপাস সড়কের টেংরারটেক এলাকায় হরতাল সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ১২ নেতাকর্মীকে আহত করে। পরে পুলিশ ৩ জনকে আটক করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৪ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
এদিকে রূপগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সভাপতি আনোয়ার সাদাত সায়েম ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কর্নগোপ এলাকায় হরতাল সমর্থনে মিছিল বের করে। বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা ৬-৭টি যানবাহন ভাংচুর করে।
সাভারে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত : সভারে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। তরে দু’চারটা লোকাল বাস ও হালকা যানবাহন চলাচল করেছে।
হরতালের সমর্থনে পৌর মেয়র রেফাত উল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে, থানা সভাপতি হাজী মাহমুদুল হাসান আলালের নেতৃত্বে সিঅ্যান্ডবি এলাকায় এবং ঢাকা জেলা যুবদল নেতা আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকায় মিছিল করেছে বিএনপি।
সিরাজগঞ্জে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে আহত ২২ : সিরাজগঞ্জে ১৮ দলের হরতালে সকালে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ভাংচুর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। এতে আহত হয়েছে ২ পুলিশসহ কমপক্ষে ২২ জন। আহতদের মধ্যে ১৩ জনকে সদর হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, সকালে শহরের ৩টি স্থানে বিএনপির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ৬০ রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।
উল্লাপাড়ায় হরতাল সমর্থকদের আ.লীগের সংঘর্ষ : উল্লাপাড়ায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ হয়েছে। সকালে জামায়াত-বিএনপি কর্মীরা শহরের থানার মোড়ে মিছিল বের করলে সংঘর্ষ বাধে। একপযার্য়ে হরতাল সমর্থকরা আওয়ামী লীগ কর্মীদের হটিয়ে পুরো শহরের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। পুলিশ ও বিজিবি বিক্ষোভকারীদের ওপর রাবার বুলেট ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
না.গঞ্জে মাহমুদুর রহমানের ছবি ছিঁড়ে গালাগাল : নারায়ণগঞ্জে সকালে শহরের স্ট্যান্টার্ড চার্টার্ড (গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক মোড় হিসেবে পরিচিত) ব্যাংকের মোড়ে হরতালকারীদের মিছিলে হামলা চালিয়ে যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রানা মুজিবকে আটকের পর চোখ বেঁধে বেধড়ক লাঠিপেটা করেছে। এতে ওই নেতার ডান হাতের কব্জি ভেঙে যায়।
বুধবার রাতে শহরের মিশনপাড়া এলাকায় শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। এটিএম কামাল ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের দুটি ছবি ছিঁড়ে ফেলে এবং তাকে গালাগাল করে।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার জানান, বুধবার রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি টিম শহরের মাসদাইর তার বাড়িতে হানা দেয়। আমাকে না পেয়ে আমার বাড়িতে থাকা স্টাফদের মারধর করে।
গ্রেফতার ১৯ : হরতালের আগের রাতে নারায়ণগঞ্জের সদর, ফতুল্লা ও রূপগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদসহ ১৫ জন গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গাজীপুরে বিএনপির কার্যালয় ভাংচুর : গাজীপুরে গতকাল সন্ধ্যায় পুলিশের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা লাঠি মিছিল নিয়ে শহরের জেলা বিএনপির কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। এ সময় ছবি তুলতে গিয়ে হামলাকারীদের মারধরে ৩ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শহরে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা লাঠি মিছিল নিয়ে গাজীপুর শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলটি রাজবাড়ী সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা জেলা বিএনপির কার্যালয়ে হামলা চালায়। এ সময় ওই কার্যালয়ের সামনে পুলিশের একটি দল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিল। হামলাকারীরা ওই কার্যালয়ের চেয়ার টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাংচুর করে। পরে তারা সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে কার্যালয়ের বিভিন্ন মালামাল পুড়ে গেছে। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা আগুন নেভায়। এ সময় বিএনপি কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ছবি তুলতে গেলে হামলাকারীরা ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের স্থানীয় প্রতিনিধি হাসান, একাত্তর চ্যানেলের প্রতিনিধি ইকবাল আহমেদ সরকার ও দৈনিক দিনকালের প্রতিনিধি দেলোয়ার হোসেনকে মারপিট করে। এতে ওই ৩ সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়। এ ঘটনার পরপরই বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে হামলাকারীরা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের দিকে চলে যায়। পরে বিএনপি ও ছাত্রদলের কর্মীরা কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকে। এতে শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং লোক জন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। এ ঘটনার জন্য বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে দায়ী করেন এবং ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
খুলনা মহানগরে শান্তিপূর্ণ, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ : খুলনায় বিএনপি ও জামায়াতসহ ১৮ দলের আহ্বানে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ, আর্মড পুলিশ ও র্যাবের কড়া টহলদারী এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের হরতালবিরোধী মিছিল ও মহড়া দিনভর প্রত্যক্ষ করেছেন নগরবাসী। সকাল ৭টার দিকে দৌলতপুর মহসিন মোড়ে পিকেটাররা একটি প্রাইভেট কার ভাংচুর করে। সাড়ে ৭টায় খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে বিএনপি-জামায়াত বিক্ষোভ মিছিল বের করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর শেখপাড়া এলাকায় দুটি ইজিবাইক এবং গোয়ালখালী এলাকায় ৩টি ইজিবাইক ভাংচুর করা হয়। পুলিশ বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার সকালে ৬ জন হরতাল সমর্থক পিকেটারকে আটক করে। তারা হলেন, ছাত্রদল নেতা অয়ন, বাপ্পী, শহিদুল এবং খানজাহান আলী থানা যুবদল নেতা মাহফুজ মোড়ল, বিএনপি নেতা ওলিয়ার রহমান ও ছাত্রদল নেতা পলাশ। বিএনপির হরতালে সকাল ৯টার দিকে মহানগর যুবদল বড় বাজার এলাকায় মিছিল করেছে।
অন্যান্য হরতালের ন্যায় গতকালও মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি কে ডি ঘোষ রোডে দলীয় কার্যালয়ে এসে পৌঁছলে পুলিশ রাস্তার দু’পাশে কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে জনগণের চলাচল বন্ধ করে দেয়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এরপর কড়াকড়ি শিথিল হলে হরতালের সমর্থনে একটি সমাবেশ করেছে বিএনপি। নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপির সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন এম নূরুল ইসলাম দাদু ভাই। বক্তব্য রাখেন, মনিরুজ্জামান মনি, সৈয়দা নার্গিস আলী, অধ্যাপক আমীর আলী, রেহেনা ঈসা, ফখরুল আলম, অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান মন্টু, আবু হোসেন বাবু, শফিকুল আলম তুহিন, শের আলম সান্টু, আজিজুল হাসান দুলু প্রমুখ। এদিকে হরতাল চলাকালে নগরীর রূপসা স্ট্যান্ড রোডে এক বিক্ষোভ মিছিল বের করে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামী। মিছিলে নেতৃত্ব দেন খুলনা সদর থানা সেক্রেটারি মো. অলিউল্লাহ, অধ্যক্ষ মুস্তাফিজুর রহমান টিংকু, আকরামুজ্জামান রাজা, এমরান হোসাইন প্রমুখ।
পাইকগাছায় বাস ভাংচুর, সড়ক অবরোধ ও মহিলাদের ঝাড়ুমিছিল : খুলনার পাইকগাছায় বাস ভাংচুর, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, সড়ক অবরোধ ও মহিলাদের ঝাড়ুমিছিলের মধ্য দিয়ে ১৮ দলের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালে পিকেটাররা একটি পরিবহন বাস, একটি মোটরসাইকের ভাংচুর ও গাছের গুঁড়ি অপসারণকালে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। হরতাল চলাকালে সকালে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা পৌর সদরে বিক্ষোভ মিছিল করে। অপরদিকে নারী ও শিশুরা সাঈদীর মুক্তি দাবিতে ঝাড়ু মিছিল করেছে। পরে জামায়াত ও বিএনপি সমর্থিত পিকেটাররা সরল বাজারসহ প্রধান সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি, বড় বড় ডালপালা, ইট, টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে ও বাস দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে সড়ক অবরোধ করে রাখে। বেলা ১১টার দিকে সরল বাজারে পিকেটাররা খুলনা-হ-১০-০৫৭৭ নং জংশন ইডি ৮০ মোটরসাইকেলটি ভাংচুর করে। এদিকে আগের দিন রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা হানিফ পরিবহন ভোরে উপজেলার কাশিমনগর এলাকায় অবস্থান নিলে কয়েক দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালিয়ে বাসের পাশের ১১টি গ্লাস সম্পূর্ণ ভাংচুর করে। পাইকগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) শেখ আবু বকর সিদ্দিক সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে রাস্তা থেকে গাছের গুঁড়ি ও ডালপালা অপসারণ করে।
ডুমুরিয়ায় জামায়াত-শিবিরের মিছিল বের করার চেষ্টা, হামলায় চারজন আহত : সাঈদীসহ সব নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া বাজারের মিছিল বের চেষ্টা করলে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ জনতা ধাওয়া করে। এ সময় দুটি চায়ের দোকান ভাংচুর ও শিবিরের ৩-৪ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
-
প্রথম পাতা

সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া










