Amardesh
আজঃঢাকা, শুক্রবার ৮ মার্চ ২০১৩, ২৪ ফাল্গুন ১৪১৯, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 আমার দেশ-এর সাথে আছেন তো?
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

৫৭ বছরে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

আ হ ম দ জা মা ন চৌ ধু রী
পরের সংবাদ»
‘চলচ্চিত্র নির্মাতার কাছে দর্শককে কখনো স্বেচ্ছাচারী একনায়ক মনে হতে পারে। কারণ এই দর্শক হৃদয়হীনভাবে অনেক ছবিই প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু সব সময় এর অর্থ এই নয় যে, এই দর্শকই ভালো সিনেমার দুশমন।’
স্ট্যানলি রিড
‘৫৭ বছরে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প’ বিষয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি বা লোকপ্রিয়ভাবে সুখ্যাত বাচসাস নামে চলচ্চিত্র ও বিনোদন সাংবাদিকদের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন আয়োজিত এই অন্তরঙ্গ বৈঠকে উপস্থিত আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো বইপত্র পড়ে বা অন্যবিধ সূত্রে এর মধ্যে জেনেছেন যে, ৫৭ বছরের প্রায় দুই মাস আগের ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট অধুনালুপ্ত ঢাকার সদরঘাট এলাকার রূপমহল সিনেমা হলে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল। ঐতিহাসিক ঘটনাটি হলো—সেদিন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর মুক্তি লাভ। বাংলাদেশ তখন রাষ্ট্রনৈতিক পরিচয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ। সে কারণেই প্রথম ছবিটির নির্মাতা প্রকৌশলী ও নাট্যামোদী থেকে আচম্বিতে সিনেমা নির্মাতা বনে যাওয়া আবদুল জব্বার খান তাঁর ছবির প্রথম প্রদর্শনীর উদ্বোধন করিয়েছিলেন তখনকার প্রাদেশিক গভর্নর শের-এ বাংলা একে ফজলুল হককে দিয়ে। কী বা কেমন ছিল সেদিনকার পরিবেশ? দেশের মানুষ কী তখনই ধারণা করতে পেরেছিল এমন ঐতিহাসিক ঘটনার পরবর্তীকালীন তাত্পর্য? কেউ কেউ পেরেছিলেন, অনেকেই পারেননি। পরবর্তী সময়ে ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তিকালীন অনেক অনুভূতির কথা আমরা এই ছবির সঙ্গে যুক্ত শিল্পী, কুশলী, নির্মাতাদের কাছ থেকে সবিস্তারে জেনেছি।
আমি নিজে, আমার চিত্রালী বেলায় এ ছবির অন্যতম নায়িকা বিদূষী জহরত আরা, পরিচালক-প্রযোজক আবদুল জব্বার খান, ক্যামেরাম্যান কিউ এম জামান, চরিত্রাভিনেতা ইনাম আহমেদ, সাইফুদ্দিন, ছবির অন্যতম নেপথ্য উদ্যোগী মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল আওয়ালসহ আরও অনেকের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সবিস্তারে কথা বলেছি। অনেকের কথা, অভিজ্ঞতা, এমনকি অশ্রুভেজা বয়ানও মুদ্রিত করেছি চিত্রালীসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকার পাতায়, বলেছিও সেসব কথা বিভিন্ন সময়ে টিভি চ্যানেলের টকশোতে।
আজকের আলোচ্য বিষয় অবশ্য শুধু ‘মুখ ও মুখোশ’ নয়, পুরো ৫৭টি বছরকে আবদ্ধ করতে হবে একটিমাত্র বৃত্তে।
স্বল্প পরিসরে স্বল্প সময়ে এ কাজ অবশ্য অসম্ভব না হলেও দুরূহ—সন্দেহ নেই। তাই ওপথে আপাতত না গিয়ে বিগত ৫৬ বছর সময়টাকে চটজলদি মুঠোবন্দি করতে একটু টেকনোঘেঁষা ও কল্পনাশ্রয়ী করে নেয়া যেতে পারে আজকের এই বৈঠকী দরবারে বয়ান করার জন্য।
অতএব, শুরুতেই আপনাদের অনুরোধ করি, এখনই মেহেরবাণী করে চোখ বুজে টাইম মেশিনে চড়ে চলে যান ৫৫ বছর আগের নভেম্বর মাসের কোনো এক শুক্রবারে।
এই কালে এবং এই মহাকাশ ও চন্দ্রাভিযান যুগের মানুষ হিসেবে কিংবা সায়েন্স ফিকশন পড়ার কল্যাণে আপনি এর মধ্যে নিশ্চয়ই জানেন যে, টাইম মেশিন হলো তেমন একটি পরিকল্পিত স্মার্ট টেকনোগেজেট, যার আরোহী হয়ে আপনি নির্দিষ্ট কিছু বোতামে চাপ দিয়ে, আরও কিছু ডিভাইস ব্যবহার করে, তিলেকমাত্র সময়ের মধ্যে, হয় অতীত কিংবা বর্তমান ভবিষ্যতের যে কোনো সময়কাল সফর করে আসতে পারেন।
অতএব, এই টেকনো পথে গিয়ে আপনার টাইম মেশিন চোখের পলক পড়তে না পড়তে, সময় স্রোতের ধকল সয়ে এসে অবতরণ করল ৫৫ বছর আগের নভেম্বর মাসের কোনো এক শুক্রবারে—এ দেশের নদীবন্দর, শহর চাঁদপুরের আজিজ আহমেদ ময়দানে। আপনি মেশিন থেকে নামলেন কিছু একটা নজরদারির জন্য। নেমেই শহরের রাস্তায় কিছুটা এগোতেই দেখলেন, ব্যান্ডপার্টি সহকারে ড্রাম-বিউগল-ক্ল্যারিওনেট বাজিয়ে কিছু মানুষ সিনেমার পোস্টার কাঁধে হেঁটে হেঁটে নাতিদীর্ঘ শহরে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবির হ্যান্ডবিল পথচারীদের মধ্যে বিলি করে বেড়াচ্ছে। একটি আট-ন’বছর বয়সী বালক হ্যান্ডবিল নিয়েই ছুট দিল অদূরে দাঁড়ানো যুবকের কাছে। বালক আর যুবক কী যেন বলাবলি করল। এখন বলি, মনে করুন, সেই বালক আমি আর যুবকটি হলো আমার ছোট মামা।
এখন আপনাদের বলি, মামার সঙ্গে আমার মতো আবদার মার্কা কথাবার্তার অর্থ হলো, মামা যেন আমাকে এক ফাঁকে দেশের প্রথম সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবিটি দেখাতে নিয়ে যান। বাবাকে তো ছবি দেখার খায়েশের কথাই জানানো যাবে না, মাকে বললেও তিনিও আগে একদিনে সাতদিনের পড়া পড়তে বসিয়ে দিয়ে পাটিগণিতের কোনো কঠিন অংক কষতেও বসিয়ে দেবেন। তার চেয়ে, সর্ব বিবেচনায় ভাগ্নেদের জন্য মামারাই, বিশেষত ছোট মামারাই নিরাপদ। টাইম মেশিনে চড়ে আগত আপনার ‘কাছে’ আমার গল্পটা আপনার গোচরেও এসেছে। পরে শহরের খাওয়ার দোকানে চাঁদপুরের মেগাসাইজের ইলিশ মাছের ঝোলমাখা ভাত তৃপ্তির সঙ্গে খেতে খেতে আপনার কানে আসবে—আশপাশের আরও তিন-চার টেবিলে যারা খাচ্ছেন, তারাও শহরের ছায়াবাণীতে লাগানো নতুন ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’ নিয়ে টেবিল গরম করা আলাপে ডুবে গেছেন। পেছনকালের একটা সময়ের নজরদার বা পর্যবেক্ষক হিসেবে আপনি সহজেই বুঝে যাবেন দেশের প্রথম ছবি হিসেবে সেই সময়ের মানুষরা ওই ছবিটিকে কতটা আপন করে নিয়েছিল, যদিও ছবিটির কারিগরি ও প্রযুক্তিগত আনাড়িপনা ছিল এর শরীর জুড়েই। দেশটির সিনেমা হল যখন ইন্ডিয়ান ও পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দু-বাংলা ছবির একচেটিয়া তাঁবেদার, তখন দুর্বল প্রযুক্তিতে নির্মিত নিজেদের প্রথম বাংলা ছবি হিসেবে দেশের সিনেমা দর্শকদের আবেগ আপনাকে মুগ্ধ করেছে ইতোমধ্যে।
অতএব আপনার প্রথম নজরদারি শেষ। আবার আজিজ আহমেদ ময়দানে ল্যান্ড করা টাইম মেশিনে চড়ে বসে যাবার বোতাম টিপলেন। এবার গন্তব্য ৫৬ বছর পূর্বের ঈদুল ফিতরের একদিন পরে রাজধানী ঢাকার মধুমিতা সিনেমা হলে।
সিনেমা হলের ওপর তলায় যেখানে প্রজেকশন অপারেটিং বিভাগ—তার পাশের একটা খোলা চত্বরে টাইম মেশিন থামতেই আপনি নামলেন। কিছুক্ষণেই দেখলেন, হলে দর্শক প্রায় উপচে পড়ছে। জানলেন, ঈদের ছবি বলে এই বাড়ন্ত ভিড়। ছবির নাম মোস্ট ওয়েলকাম। এইমাত্র ৫৬ বছর আগে দেখে আসা ‘মুখ ও মুখোশ’-এর তুলনায় ৫৫ বছর পরের দর্শকরা মোস্ট ওয়েলকামকে কী বেশি ওয়েলকাম করছে বা স্বাগত জানাচ্ছে? দুই সময়ের, দুই কালের দু’রকম বিচারের ভিত্তি হওয়াই স্বাভাবিক। তবু নজরদার হিসেবে আপনি নিরাসক্তভাবে বুঝবেন, আগের আনাড়ি ছবিটা ছিল দেশীয় পরিবেশের গন্ধমাখা ভালোবাসার আতর ছিটানো ছবি। আর এখনকার টাকা-ডলার-রিঙ্গিত-রুপি খরচ করে বানানো ছবিটা রংদার, চমকদার বেশি হলেও সর্বাঙ্গজুড়ে যেন কৃত্রিমতা। বিদেশি চাকচিক্যে প্রলুব্ধ হয়ে, কিছু কিছু বিদেশি হাতের স্পর্শে বানানো ‘মোস্ট ওয়েলকাম’ সৃজনশীলতার স্পর্শে অতটা উতরে তো যায় না, যতটা উতরে গেছিল সেই আদিকালের ‘মুখ ও মুখোশ’। সিনেমাকে আর সবকিছুর মতো বিশ্বায়িত অবশ্যই আমরা করব, তবে দেশীয়তা বাদ দিয়ে নয়। আমরা বিশ্বায়িত সিনেমার সহযাত্রী হব, তাদের অক্ষম ঈড়ঢ়ু ঈঁঃ বা নকলনবিশ বিড়ালটা হব কেন যে আনাম জিনিস না খেয়ে শুধু হাড়-কাঁটা খেয়েই সন্তুষ্ট বা তাড়া খেয়েই সন্তুষ্ট থাকে।
তবে ৫৬ বছর পেরিয়ে ৫৭ বছরে পা দেয়া ‘মোস্ট ওয়েলকাম’-এও আছে এগিয়ে যাওয়ার কিছু ছাপ, অদক্ষ ছাপ হলেও।
টাইম মেশিনে আপনি আপনার এই সময়ের আপাতত যাত্রা বিরতি ঘটালেন এ মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার। সেদিন আপনার টাইম মেশিন নামল বসুন্ধরা সিটির কোনো ল্যান্ডিং চধফ-এ। এবার আপনার গন্তব্য এই কমপ্লেক্সের সিনেপ্লেক্সের একটিতে যেখানে চলছে এ যাবতকালের বাংলাদেশী সেরা বাঙালিদের অন্যতম সেরা হুমায়ূন আহমেদের শেষ ছবি ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’র প্রদর্শনীতে। কিছুক্ষণেই আপনি দেখলেন দর্শক ভরপুর প্রদর্শনী চলছে ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’র এবং বুঝে গেলেন হৃদয় ছুঁয়ে গেছে দর্শকের এই ছবি।
সেকালের প্রথম ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর নির্মাতা আবদুল জব্বার খান এবং একালের আলোচ্য সময়ের অন্যতম সর্বশেষ ছবির নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ—দু’জনই ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা দু’জন মানুষ। আরও দেশোয়ালি ভাষায় বলতে গেলে খোয়াবে তাড়া খাওয়া দুই মানুষ। তাঁরা যা ভেবেছেন, যা করতে চেয়েছেন, তাঁদের পুরো আবেগ-অনুরাগ ঢেলে সেটা করেছেন এবং এভাবেই এদেশের সিনেমা খাতার পাতায় চিরকালের জন্য অবশ্য স্মর্তব্য, দু’টি উজ্জ্বল নাম হয়ে থাকলেন তাঁরা দু’জন এবং কী পরিহাস, দু’জনই আজ অন্যলোকে।
‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ পর্যন্ত বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাস, এক কথায় উজানের বিপরীতে অনেক বাধা পেরিয়ে এগোনোর ইতিহাস। সূচনা পর্বের বাধা যদি ছিল উত্তাল-অকুল সাগরের মতো কূল-কিনারাবিহীন দিগন্তবিস্তারী, তাহলে এই একবিংশ শতাব্দীর একযুগ সময়কালে পৌঁছে তা হয়ে গেছে হিমালয়ের সব থেকে উঁচু চূড়া ছুঁয়ে আসবার মতো চ্যালেঞ্জিং। আমাদের দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা সমস্যার অকূল সাগর যেমন পাড়ি দিয়েছেন, তেমনি পর্যায়ে পর্যায়ে ইতিহাসের বাঁক ফেরানোর মুহূর্তগুলোতে চ্যালেঞ্জও জয় করে বিভিন্ন শিরোপা ছিনিয়ে এনেছেন। ভাবতেই অবাক লাগে, কত রকমের চ্যালেঞ্জ। কত বিবিধ সমস্যা। প্রথমেই উদ্যোক্তা খুঁজে পাওয়ার সমস্যা, উদ্যোক্তা যোগাড় হলো তো শুরু হলো পুঁজি যোগাড়ের সমস্যা। শিল্পী-কুশলী সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ, কারিগরি চ্যালেঞ্জ, সিনেমা হলে বাজারজাত করার চ্যালেঞ্জ, বিদেশি ছবির স্থানীয় এজেন্ট চক্রের চক্রান্তকে রুখে দেয়ার চ্যালেঞ্জ।
এত সমস্যা, এত চ্যালেঞ্জ দু’ পায়ে মাড়িয়ে বাংলাদেশে একটি টেকসই এবং বাজার এবং শিল্পবান্ধব (আর্ট এবং ইন্ডাস্ট্রি উভয় অর্থে) চলচ্চিত্র শিল্প স্বনির্ভরতার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পেরেছিল চলচ্চিত্র শিল্পের সূচনাপর্বে যুক্ত হওয়া ও সৃজনশীল নির্মাতা-শিল্পী-কুশলীদের আগমনের কারণে। পরিবর্তনের ডঙ্কা বাজিয়ে জাতিকে তাঁরা সচেতন করে তুলেছিলেন আপন দেশের সিনেমাকে, এই সিনেমার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ভালোবাসতে বাধ্য করেছিলেন দেশবাসীকে। শুরুর বছরগুলোর এসব অগ্রপথিক বা দিশারিদের মধ্যে আবদুল জব্বার খানের দেখানো পথে অচিরেই আলোর যাত্রী হয়ে এলেন সালাউদ্দিন, ফতেহ লোহানী, এজে কারদার, এহতেশাম, মুস্তাফিজ, জহির রায়হান, সুভাষ দত্ত, খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, মিতা, আমজাদ হোসেন, ফখরুল আলম, চাষী নজরুল ইসলাম, মোরশেদুল ইসলাম, সালাহউদ্দিন কাজী আরও কিছু উজ্জ্বল মানুষ। ভাবতে এখন অবাক লাগে, গত শতাব্দীর পাঁচের দশকের শেষ ভাগে (১৯৫৯) নির্মিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে উর্দু ভাষায় নির্মিত ‘জাগো হুয়া সাবেরা’ সেই সময়েই দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে স্বর্ণপদক জয় করে এনেছিল।
এদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের যাবতীয় সুবিধা বঞ্চিত পরিবেশে ‘মুখ ও মুখোশ’ তৈরি হয়েছিল কিছুটা বুঝে—অনেকটাই না বুঝে।
তারপর যতই দিন গেছে, আমাদের নির্মাতা-কুশলী ও শিল্পীরা ক্রমশ পরিণত হয়েছেন—এদের কেউ বিদেশ থেকে কিছু জেনে এবং সিনেমা তৈরির জন্য মন, মেধা, জ্ঞান ও সাহস সঞ্চয় করে, নিজেদের কিছুটা তৈরি করে ঢুকে পড়েছিলেন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে। আবার পুরো শিখে বা আধা শিখে আসা মানুষদের দেখে, তাঁদের সাহচর্যে এসে অন্যরা শিখেছেন। এভাবেই ক্রমান্বয়ে আমাদের ফিল্ম আর্ট এবং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এদেশে বিংশ শতাব্দীর ৬০ দশকের মধ্যেই ঈর্ষণীয়ভাবে বাড়বাড়ন্ত হয়ে উঠল। ১৮৯৫ সালে ফ্রান্সের লুমিয়ের ব্রাদার্স’-এর বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র তৈরির ৬০ বছর পরে তৈরি এদেশের প্রথম সিনেমা। সিনেমা আর্ট এবং সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি একটি জটিল মাধ্যম যা হয়তো একজন, দু’জনের মগজ শিশু বা ব্রেইন চাইল্ড হয়েই জন্মায়; কিন্তু অন্যান্য ব্যক্তিনির্ভর শিল্পের সঙ্গে এর ভিন্নতা হলো এভাবে যে, একক চিন্তাটাকে একত্রিত করে বা একটা টিমওয়ার্কের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করে তুলতে হয়। তাই এটি যৌথ শিল্পও বটে। সিনেমার এই শর্ত মেনেই এদেশের সিনেমাও বিকশিত হয়েছে, ভালো চলনসই এবং মন্দ বা বাজে সিনেমা কিংবা গুড, ব্যাড সিনেমাও উপহার দিয়েছে এবং মাঝে মাঝে সঙ্কটে পড়ে বিপদাপন্ন হয়েছে। সর্বনাশা পথেও হেঁটেছে। ’৬০-’৭০, ’৮০-এই তিনটি দশক এগোবার পর হঠাত্ই নব্বই দশকে থমকে দাঁড়ায় আমাদের সিনেমা। কী করে, কোন গোপনে যেন সিঁদ কেটে সিনেমায় ঢুকে পড়ে অশ্লীলতা এবং অপসংস্কৃতির ভয়াবহ ভাইরাস। আশ্চর্যের ব্যাপার, স্বৈরশাসনের অবসানের পর এই অপচর্চা ভাইরাস বেড়ে উঠল গত ২২ বছরের গণতান্ত্রিক সরকারের শাসন আমলেই। এই অপচর্চায় কী বিএনপি আমল, কী আওয়ামী লীগ আমল—কোনো আমলই পিছিয়ে থাকল না। এটাই একটা ট্র্যাজেডি। অপকাজের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে গণমাধ্যমে বিতর্ক হলো, সারা দেশে দর্শকের প্রতিবাদের কণ্ঠ শোনা যেতে লাগল এবং এই কারণেই এই দশকের প্রথম দশকের মধ্যভাগেই মুমূর্ষু অবস্থা তৈরি হতে আমরা দেখলাম।
আমাদের চোখের সামনে আমরা অনেকেই এই ইন্ডাস্ট্রির সূচনা সংগ্রাম, বিকাশ সংগ্রাম এবং সমৃদ্ধির মৌসুমগুলো দেখেছি, দেখে কখনও ঋদ্ধ হয়েছি, কখনো আবার হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছি।
তবুও পতনের দ্বারপ্রান্তেও আবার নতুন করে বাঁচার স্বাদ জাগে, আবার মাথা তুলে দাঁড়াবার ইচ্ছা হয়। বিজ্ঞানে থার্মোডিনামিক্স বলে একটা শাস্ত্র আছে। এই শাস্ত্রের একটা মূল সূত্র হলো, প্রতি বস্তুর জন্ম, বিকাশ ও বিলয় আছে, আছে পুনঃবিকাশও। এই সূত্র ধরে সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজ-সভ্যতার উত্থান-পতনও বিচার করেন।
তাই আশা জাগে—সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চলচ্চিত্র গুরুত্বের সঙ্গে আবার আলোচিত হচ্ছে।
বর্তমান শাসনামলে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। অতীতেও সরকারি উচ্চস্তর থেকে ইন্ডাস্ট্রি ঘোষিত হয়েছিল এই গণমাধ্যমটি। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির সুবিধা পায়নি অতীতে। আমাদের আশা থাকবে, এবার আমাদের সিনেমা শিল্প সত্যিকার ইন্ডাস্ট্রি হয়ে উঠবে এবং বিগত বছরগুলোর যাবতীয় ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে আবার জেগে উঠবে। এফডিসি বিশ্বের সর্বাধুনিক সব প্রাগ্রসর সিনেমা কারখানাগুলোর সমপর্যায়ের হয়ে উঠবে, বর্তমান সরকার বরদ্দকৃত প্রায় ৬০ কোটি টাকা এফডিসির হালনাগাদকরণে সদ্ব্যবহার হবে, দুর্নীতির চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে না আশা করি।
কারণ, আশা ছিল বলেই তো ৫৬ বছর আগে আমাদের দেশের কিছু মানুষ এদেশে চলচ্চিত্র শিল্পের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। হ
ধন্যবাদ। *
* প্রবন্ধটি ২১ সেপ্টেম্বর ২০১২, জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে বাচসাস আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ হিসেবে পঠিত।