Amardesh
আজঃ ঢাকা, সোমবার ২১ ডিসেম্বর ২০০৯, ৭ পৌষ ১৪১৬, ৩ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --

সিলেটে পাথর কোয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে চাঁদাবাজি : দৈনিক ৫০ লাখ টাকা চাঁদা তোলার অভিযোগ উপজেলা চেয়ারম্যানদের

ইকবাল মাহমুদ, সিলেট
সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে প্রতিদিন চাঁদা উত্তোলনের মহোত্সব নিয়ে বেশ ক’দিন ধরে তোলপাড় চলছে সিলেটে। বিশেষ করে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে দৈনিক আড়াই লাখ টাকা চাঁদা নেন কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি সারোয়ার আহমদ। চাঞ্চল্যকর এ অভিযোগ নিয়ে গতকাল ব্যাপক হৈচৈ হয়েছে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা কমিটির নিয়মিত সভায়। ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে অভিযোগ তদন্তে জেলা প্রশাসক ও এসপির সমন্বয়ে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে কমিটি কর্তৃক সরেজমিন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়।
জানা যায়, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে বিভিন্ন স্তরে প্রতিদিন অন্তত ৫০ লাখ টাকা চাঁদা উত্তোলন করছে স্থানীয় যুবলীগ নেতা শামীমের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট। ক্ষমতাধর এ যুবলীগ নেতা এরই মধ্যে এলাকায় ‘পাথর রাজা’ খেতাবে পরিচিতি লাভ করেছেন। শামীমের এ চাঁদার ভাণ্ডার থেকে স্থানীয় এমপি, প্রশাসন, পুুলিশ, বিডিআর, আওয়ামী লীগ নেতা কেউ ফেরেন না খালি হাতে। মাসে কিংবা সপ্তাহে নয়, প্রতিদিন গভীর রাতে কালো ব্যাগে ভর্তি করে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের কাছে নির্দিষ্ট হারের টাকা পৌঁছে যায় নিরাপদে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে দৈনিক আড়াই লাখ টাকাসহ ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালী নেতাদের বাড়িতেও প্রতিদিন পৌঁছে যায় নগদ নারায়ণ।
গতকাল সকালে জেলা প্রশাসক সাজ্জাদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভার শুরুতেই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারির বেপরোয়া চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন বিয়ানীবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আবদুল খালিক মায়ন। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এতে সরকারের ইমেজ দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একটি বিশেষ মহল ওপেন সিক্রেট কায়দায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি করে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও দফতরের নাম ব্যবহার করছে। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হলেও প্রশাসন কেন এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না জানতে চান এই উপজেলা চেয়ারম্যান। তার এ বক্তব্যের সমর্থনে সভায় অংশগ্রহণকারী সবাই বক্তব্য রাখেন। এ সময় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান তৈয়বুর রহমানসহ উপস্থিত জনপ্রতিনিধিরা ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারির সর্বগ্রাসী চাঁদাবাজির নানা কলাকৌশল নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। তারা জানান, স্থানীয় পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের পাড়ুয়া গ্রামের যুবলীগ নেতা শামীমের একক নিয়ন্ত্রণে এখন পুরো ভোলাগঞ্জ পাথর রাজ্য। ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল বাছিরের ছেলে ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জয়নাল আবেদীনের ছোট ভাই এই শামীম।
অভিযোগ রয়েছে, কোয়ারি এলাকা থেকে প্রতিদিন অন্তত ৫০ লাখ টাকা চাঁদা তোলে শামীমের নিজস্ব বাহিনী। এ চাঁদাবাজি থেকে কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি সারোয়ার আহমদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে প্রতিদিন আড়াই লাখ টাকা করে গ্রহণ করেন বলে জানা গেছে। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ আড়াই লাখ টাকা নেন শামীমের কাছ থেকে। এমপি ইমরানের ড্রাইভার লিয়াকত এ টাকা শামীমের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন বলে জানানো হয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়। সভায় জনপ্রতিনিধিরা জানান, বিডিআরের ২১ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল খন্দকার জহিরুল আলমকে দৈনিক দু’লাখ টাকা দেয় শামীম। এ টাকা কোয়ারিতে অবস্থিত বিডিআরের বিশেষ ক্যাম্পের হাবিলদার ও সৈনিকদের মধ্যে নির্দিষ্ট হারে বিতরণ করেন এই কমান্ডিং অফিসার। এছাড়া স্থানীয় পুলিশ, আনসার, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এবং ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন নেতার মধ্যে বণ্টন করে শামীম। ফলে রহস্যজনকভাবে এত সর্বগ্রাসী চাঁদাবাজির উত্সব চললেও কোনো মহলে তেমন অসন্তোষ দেখা যায় না।
কোয়ারি এলাকার এক এক সাইটে তার চাঁদাবাজির ধরন ও কৌশল একেক রকম। কোথাও বিডিআরের নামে, কোথাও পুলিশ কিংবা রেলওয়ে বিভাগের নামে; আবার কোথাও খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ চাঁদা নামে পাথর ব্যবসায়ী ও বারকী শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলন করে শামীম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোয়ারি এলাকাকে ৫টি ভাগে ভাগ করে নিজস্ব বাহিনী দিয়ে প্রতিদিন রমরমা চাঁদাবাজি করে আসছে শামীম। সূত্র জানায়, ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডের পার্শ্ববর্তী এলাকা চাঁদাবাজি মিশনের ‘১নং এরিয়া’ হিসেবে নাম দিয়েছে শামীম বাহিনী। এই এলাকায় দু’শ’টি পাথরের গর্ত রয়েছে। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই এসব গর্তের প্রতি হাত জায়গার জন্য এক হাজার টাকা আদায় করে শামীম। এভাবে ৫০ থেকে দু’শ’টি গর্ত হতে এককালীন প্রায় দুই কোটি টাকা উত্তোলন করে শামীম। এছাড়া এই এলাকার প্রতিটি গর্তের জন্য দৈনিক ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা হারে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা তোলা হচ্ছে। বিডিআরের স্থানীয় বিওপির ‘মেস খরচে’র (খাবারের বিল) কথা বলে এ টাকা উত্তোলন করা হয় বলে জানা গেছে। আর এক্ষেত্রে কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো অজুহাতে বিডিআর দিয়ে আটক করিয়ে নির্যাতন করায় শামীম।
শামীম বাহিনীর চাঁদাবাজি রাজ্যের ২ নং এলাকায় রয়েছে মাঝের ছড়া এলাকার একশ’টি পাথরের গর্ত। এখানকার প্রতিটি গর্ত থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা হারে দৈনিক ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। এ টাকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দফতরের নামে আদায় করা হয় বলে জানা গেছে স্থানীয় সূত্রে। রেলওয়ে নিয়ন্ত্রণাধীন বাংকারের পূর্বদিকে অবস্থিত আরও শ’খানেক এলাকা নিয়ে রয়েছে শামীম বাহিনীর চাঁদাবাজি রাজ্যের ৩য় অংশ। এখানেও গর্ত প্রতি ২ থেকে ৭ হাজার টাকা হারে দৈনিক ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা তোলা হয় রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ভাঙিয়ে। এদিকে শামীমের বদৌলতে সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডের ভেতর থেকেও পাথর তোলায় কোনো সমস্যা হয় না। তবে এক্ষেত্রে বিডিআর এবং বিএসএফের মধ্যে বিতরণের জন্য শামীমের তহবিলে জমা দিতে হয় নৌকাপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা হারে দৈনিক আরও ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা। বর্ষাকালে নৌকার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যায় বহু গুণ। এটি তার চাঁদাবাজির ৪নং এলাকা বলে জানানো হয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়। এদিকে চাঁদাবাজির ৫ নং এলাকায় রয়েছে ইঞ্জিনচালিত সেইভ মেশিন জোন। এখান থেকেও তোলা হয় দৈনিক ৫ লাখ টাকার চাঁদা।
ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি এলাকার এ অবাধ চাঁদাবাজি সরকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে জানানো হয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়। সভায় জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন জেলা প্রশাসক সাজ্জাদুল হাসান ও পুলিশ সুপার রুহুল আমিন। আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে পুলিশ সুপার রুহুল আমিন জানান, দুয়েকদিনের মধ্যে তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সভায় প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর, বিয়ানীবাজার উপজেলার চেয়ারম্যান আবদুল খালিক মায়ন, গোয়াইনঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম, জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ আল হোসাইন, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ, বালাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মুস্তাকুর রহমান মফুর, বিশ্বনাথ উপজেলা চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান, জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাব্বির আহমদ ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ন ম শফিকুল হক উপস্থিত ছিলেন।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?