Amardesh
আজঃ ঢাকা, শনিবার ১৯ ডিসেম্বর ২০০৯, ৫ পৌষ ১৪১৬, ১ মহররম ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 জব সার্চ
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --

শাবিতে জাহানারা ইমামের নাম পুনর্বহালের উদ্যোগ : ক্যাম্পাসে উত্তেজনা

ইকবাল মাহমুদ, সিলেট
সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও শুরু হয়েছে বিতর্কিত নামকরণ প্রক্রিয়া। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে স্থগিত থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ভবনের বিতর্কিত নামকরণ ফের বাস্তবায়নের চেষ্টা শুরু হয়েছে। আর এ ইস্যুতে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু অঘটনের নায়ক এক শিক্ষক দম্পতির নেতৃত্বে বিশেষ মহল এ বিতর্কিত নামকরণ পুনর্বহালে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনা সভায় ভিসির উপস্থিতিতে তারা এ নামকরণ পুনর্বহালের ঘোষণা দিয়ে ক্যাম্পাসে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
১৯৯৯ সালের ৩০ আগস্ট শাবির ৮৭তম সিন্ডিকেট সভায় কতিপয় বিতর্কিত ব্যক্তির নামে দুটি হল এবং ৬টি ভবনের নামকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সিলেটের মানুষ। বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম বাতিল করে হযরত শাহজালাল (রঃ)-এর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার নামে হল ও ভবনের নামকরণের দাবি ওঠে। আর এ দাবিতে সিলেটজুড়ে গড়ে ওঠে তীব্র গণআন্দোলন। প্রায় সব ক’টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে তুমুল আন্দোলনের কারণে প্রায় ৯ মাস বন্ধ থাকে শাবি ক্যাম্পাস। বিডিআরের গুলিতে প্রাণ হারায় আবদুল মুনিম বেলাল নামের এক মাদ্রাসা ছাত্র। সবশেষ ২০০০ সালের ৬ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এ বিতর্কিত নামকরণের সিদ্ধান্ত স্থগিত করলে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। দীর্ঘ ৯ মাসের অচলাবস্থার পর খুলে দেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
এদিকে বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটি বিশেষ মহল স্থগিত থাকা নামকরণ পুনর্বহালের জন্য তত্পর হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে তারা প্রথম ছাত্রী হলের সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলেছে। সেখানে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হল লেখা সাইনবোর্ড প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন অফিসিয়াল ডকুমেন্টেও ইদানীং প্রথম ছাত্রী হলের পরিবর্তে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হল লেখা হচ্ছে। বিজয় দিবস ও শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হল’ লেখা পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ ব্যাপারে হলের প্রভোস্ট ড. ইয়াসমিন হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, হলের ছাত্রীরা এটি করেছে। তবে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম এবং মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, আমি ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হলে’র প্রভোস্ট, ‘প্রথম ছাত্রী হলে’র নই। তিনি দাবি করেন, ২০০০ সালে তত্কালীন রাষ্ট্রপতির মৌখিক সিদ্ধান্তে এ নামকরণ স্থগিত করা হয়েছিল। এর কোনো লিখিত ডকুমেন্ট নেই। তিনি জানান, তখন বলা হয়েছিল, নামকরণ স্থগিত সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ চিঠি আকারে শাবি সিন্ডিকেটের কাছে পাঠানো হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো চিঠি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেনি। ফলে শহীদ জননী জাহানারা ইমামসহ অন্যান্যের নামে হল ও ভবনের নামকরণ কার্যকর করতে কোনো বাধা নেই বলে মনে করেন ড. ইয়াসমিন হক।
অন্যদিকে নামকরণ পুনর্বহাল নিয়ে ড. ইয়াসমিন হকসহ কতিপয় শিক্ষকের তত্পরতায় ক্ষোভ ও উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন শাবি শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ। সমিতির সভাপতি ড. আহমদ কবির ও সাধারণ সম্পাদক ড. আশরাফ উদ্দিনের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষক ১৬ ডিসেম্বর ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে ড. ইয়াসমিন হকের অপসারণ দাবি করেছেন। তারা বলেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অবজ্ঞা করে ড. ইয়াসমিন হক ও তার অনুসারীরা গায়ের জোরে বিতর্কিত নামকরণ চর্চা করে যাচ্ছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। শিক্ষক নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, ড. ইয়াসমিন হক ও তার স্বামী ড. জাফর ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমান্তরাল আরেকটি বিকল্প প্রশাসন গড়ে তুলেছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারা ভিসিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, অতিউত্সাহী কতিপয় ব্যক্তির কারণে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ফের কোনো সঙ্কটে পড়লে এর দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিতে হবে।
এদিকে শাবি ভিসি প্রফেসর ড. সালেহ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এই মুহূর্তে নামকরণ পুনর্বহালের কোনো পরিকল্পনা শাবি প্রশাসনের নেই। তিনি বলেন, ’৯৯ সালে যারা এ নামকরণের প্রস্তাব করেছিলেন, তারা স্বভাবতই এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তা পুনর্বহালের দাবি তুলছেন। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে নামকরণের সিদ্ধান্ত স্থগিত রয়েছে এবং তা পুনর্বহালের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. আশরাফ উদ্দিন আহমদ আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে জানান, ২০০০ সালে সিলেটবাসীর সেন্টিমেন্টের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে তত্কালীন চ্যান্সেলর বিতর্কিত নামকরণ সংক্রান্ত সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট গঠন করে তিনি সিনেটের মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, যেহেতু এখনও সিনেট গঠন করা হয়নি এবং এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেয়া হয়নি, সুতরাং চ্যান্সেলরের স্থগিতাদেশ আজও কার্যকর রয়েছে।
এদিকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কিত নামকরণ পুনর্বহালের প্রক্রিয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিলেটের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। খোদ মহাজোটের শরিক দলের নেতারা এ প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, কতিপয় অতিউত্সাহী বাম শিক্ষকের ব্যক্তিগত জেদ চরিতার্থ করতে সরকার এ ধরনের হটকারী সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই তারা বিশ্বাস করেন। সিলেট জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট গিয়াস উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করলে চলবে না। দেশের প্রায় সব ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকার নামে। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে সিলেট শব্দ যুক্ত না করে ওলীকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রঃ)-এর নাম যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম ছাত্র হলের নাম তার অন্যতম সহচর হযরত শাহ পরান (রঃ)-এর নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর এতেই প্রমাণ হয়, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওলীকুল শিরোমণিদের নামের পাশে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তির নাম সংযুক্ত হতে পারে না।
সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, কারও ব্যক্তিগত আবেগ প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা উচিত নয়। আর ক্ষমতার জোরে তা করার চেষ্টা করা হলে সেই ক্ষমতার মসনদই জনগণ ছিনিয়ে নেবে। তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে তত্কালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগান্তকারী উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু ওলী-আউলিয়াদের নামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি সেখানে তার নাম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সবিনয়ে ফিরিয়ে দেন। সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, একটি মীমাংসিত ইস্যুকে ফের সামনে এনে কেউ যদি সিলেটবাসীর প্রাণের এ বিশ্ববিদ্যালয়কে অকার্যকর করতে চায়, তবে তাকে চিহ্নিত করতে সিলেটবাসী অতীতেও ভুল করেনি ভবিষ্যতেও করবে না।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?