Amardesh
আজঃ ঢাকা, শনিবার ১৯ ডিসেম্বর ২০০৯, ৫ পৌষ ১৪১৬, ১ মহররম ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 জব সার্চ
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --

১৪ দলের টানাপড়েন

এমরান হোসাইন
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মধ্যে এক বছরের বেশি কোনো বৈঠক হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই শরিকদের সঙ্গে বৈঠকের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও গত আড়াই মাসে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে জোটের শরিকরা। এদিকে ক্ষমতা গ্রহণের সময় যথাযথ মূল্যায়ন না পেয়ে ১৪ দলীয় শরিকসহ মহাজোটের অপর শরিক জাতীয় পার্টি শুরু থেকে সরকারের ওপর বেজার রয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছে। জাতীয় পার্টির প্রধান এইচএম এরশাদ নিজেই সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন। ডেনমার্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এরশাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের এরশাদ পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছেন। সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটের শরিকদের মধ্যে এক প্রকার টানাপড়েন চলছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও আন্দোলন-পরবর্তী নির্বাচন ও ক্ষমতা গ্রহণ প্রশ্নে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বাম ঘরনার ১১ দল, জাসদ ও ন্যাপকে (মোজাফফর) নিয়ে ১৪ দলীয় জোট গঠন করে। ২৩ দফার ওপর ভিত্তি করে গঠিত এই জোট নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে নির্বাচনের আগে এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিসহ আরও কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়। মহাজোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। জোট নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল অবস্থান অনুযায়ী এসব দলের শীর্ষ নেতারা মন্ত্রী অথবা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার অংশীদার হবেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনে শরিকরা সঠিকভাবে মূল্যায়িত না হওয়ায় জোটে চিড় ধরতে শুরু করে। শরিকদের মধ্য থেকে ১৪ দলের মধ্যম সারির নেতা সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরকে সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হয়। সরকার গঠনের সময় ১৪ দলের প্রথম সারির নেতা রাশেদ খান মেনন কিংবা হাসানুল হক ইনুর মতো নেতারা ছিটকে পড়েন। জাতীয় পার্টির প্রধান এইচএম এরশাদকে রাষ্ট্রপতি করার মৌখিক চুক্তি থাকলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এমনকি এরশাদকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দূত করার খবর শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তাও হয়নি। এসব কারণে শুরুর দিক থেকেই শরিকদের সঙ্গে সরকারের টানাপড়েন শুরু হয়।
নির্বাচনের পরই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আদর্শিক জোট ১৪ দল। মহাজোট নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ এক বছরের মতো পার হলেও এর মধ্যে ১৪ দলের একটি বৈঠকও হয়নি। বিগত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালের নভেম্বরের শেষদিকে আসন-বণ্টন নিয়ে পরপর কয়েকটি বৈঠক হলেও তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো বৈঠক হয়নি। রাজনৈতিক জোট হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে এ জোটের শরিকদের যোগাযোগও বর্তমানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ কারণে শরিকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জোট ক্ষমতায় গেলেও তারা রয়েছেন ক্ষমতার বাইরে। ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হলেও তারা সবসময়ই জোটগতভাবে জাতীয় ইস্যুতে রাজপথের আন্দোলনে থেকে অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকারে জোটভুক্ত থাকায় সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েও তারা অগ্রসর হতে পারছে না।
সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ১৪ দলের বৈঠকের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রস্তাব দিলেও দীর্ঘদিন ধরে সাড়া মেলেনি। কাউন্সিলের পর গত ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির কার্যনির্বাহী সংসদের প্রথম বৈঠকে সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ হাসিনা ১৪ দলীয় শরিকদের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা পোষণ করেন, যা দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী সাংবাদিকদের অবহিত করেন। কিন্তু তারপর আড়াই মাসের বেশি অতিবাহিত হলেও কোনো বৈঠক হয়নি।
১৪ দলের অবস্থা জানতে চাইলে রাশেদ খান মেনন কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গতকাল আমার দেশকে তিনি বলেন, ১৪ দল বর্তমানে বিশ্রী অবস্থায় রয়েছে। আমরা সরকারি দলের প্রধানসহ একাধিক নেতার সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েও সাড়া পাইনি। তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বৈঠকের উদ্যোগের কথা জানালেও তার বাস্তবায়ন দেখছি না। ভবিষ্যত্ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে তাতে ভবিষ্যত্ নিয়ে কী মন্তব্য করব। আগেই বৈঠক হওয়া উচিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, এক বছরের বেশি হলো কোনো বৈঠক হয়নি। ফলে জোটের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা থাকাটা স্বাভাবিক।
কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা দূর করতে ১৪ দলের বৈঠক হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। বৈঠকের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ইনু জানান, প্রধানমন্ত্রী ও জোটনেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে আমরা বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছি। তারা শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানাবেন বলেছেন। আশা করছি নতুন বছরের শুরুতেই বৈঠক হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, তেল-গ্যাস জাতীয় সম্পদ, আঞ্চলিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক পদক্ষেপসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন। অনেক বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এগুলো দূর করা প্রয়োজন। ১৪ দল এখনও কার্যকর রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার ১৪ দলের আগের সিদ্ধান্তগুলোই বাস্তবায়ন করছে।
শরিক ১৪ দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বৈঠকের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেন, আমার এ বিষয় সম্পর্কে জানা নেই। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও নই। দলের মুখপাত্র সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কিংবা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ ভালো বলতে পারবেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি। টেলিফোনে মাহাবুব-উল আলম হানিফের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।
এদিকে মহাজোট সরকার গঠনের পর থেকে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু ও জনজীবনের সমস্যা শরিকরা সরকারের বিরুদ্ধে নিয়ে মুখ খুলেছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, জাসদ নেতা মইনউদ্দীন খান বাদলসহ একাধিক নেতা গ্যাস ব্লক ইজারা, দ্রব্যমূল্য, টিপাইমুখ বাঁধসহ বিভিন্ন জাতীয় বিষয় নিয়ে সংসদের ভিতর ও বাইরে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজির সমালোচনা করে তারা সরকারের একটি অংশের বিরাগভাজন হন বলে জানা গেছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। সরকারের সঙ্গে তার দলের চাওয়া-পাওয়ায় মিলমিশ হয়নিও বলেও তিনি একাধিকবার মন্তব্য করেছেন। বৃহস্পতিবার সিলেটে দলীয় কর্মসূচিতে বক্তব্যকালে এরশাদ অভিযোগ করেন, জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে ক্ষমতায় গিয়ে সরকার তাদের সঙ্গে প্রথম প্রতারণা করেছে। অবদান অনুযায়ী তার দলকে মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রতারণা অব্যাহত থাকলে সময়মত জবাব দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সম্প্রতি তাদের শরিক জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সম্প্রতি তিনি বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে এরশাদকে স্বৈরশাসক উল্লেখ করে তার শাসনামলের কঠোর সমালোচনা করেন। এইচএম এরশাদ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করেছেন বলেও ডেনমার্ক সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানকার প্রবাসীদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অভিযোগ তোলেন। একে অপরের প্রতি এসব উস্কানিমূলক বক্তব্য আর পরস্পরবিরোধী অবস্থান চলতে থাকলে ক্ষমতসীন জোটের এই ঐক্য আর কতদিন টিকে থাকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?